বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: মা দুর্গাকে কন্যারূপে ঘরে পাওয়ার আকুলতা আর শতবর্ষের পুরোনো কুলাচার—সবমিলিয়ে বালিয়া-মৃত্যুঞ্জয়পুর গ্রামের হালদার বাড়ির দুর্গোৎসবের নিজস্ব একটা সুবাস রয়েছে। ১৩১৬ বঙ্গাব্দে হরেন্দ্রনাথ হালদার যে পুজোর সূচনা করেছিলেন, আজ তা ১১২তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। এই পূজার প্রতিটি আচারেই যেমন জড়িয়ে রয়েছে বাংলার আবহমান সংস্কৃতি, তেমনই এর নৈবেদ্যে রয়েছে এক অন্য রাজ্য ও সংস্কৃতির সুনিবিড় যোগ।
হালদার বাড়ির এই পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল দেবীর নৈবেদ্যে উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরের বিশেষ ‘লাল-চিনি’র ব্যবহার। বাংলার সাধারণ পুজোগুলোয় যেখানে স্থানীয় বা সাধারণ সাদা চিনির ব্যবহারই প্রচলিত, সেখানে উত্তরপ্রদেশের সুদূর গাজিপুর থেকে সংগৃহীত এই লাল-চিনি নিবেদনের ঐতিহ্য বংশপরম্পরায় আজও নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষা করে আসছে পরিবারটি। শতবর্ষের বেশি সময় ধরে বাংলার এক নিভৃত গ্রামের পূজাবাড়ির সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের এই ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ সত্যিই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক দুর্লভ ইতিহাস।
পুজোর ৩ দিন আগে থেকেই মিষ্টি তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় হালদার বাড়িতে। শীতল-ভোগের জন্য পেঁড়া এবং দশমীর পূজার জন্য খই, মুড়কি, নাড়ু সবই তৈরি হয় ঘরোয়া পন্থায়। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণ মতে পুজো হলেও মহাষ্টমীর নৈবেদ্যে নারকেল বর্জন এবং মহানবমীতে দুধ-নারকেলের বিশেষ পদের মতো বহু সুপ্রাচীন কুলাচার হালদার বাড়ির পুজোকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র মাত্রা।
প্রপৌত্রদের তত্ত্বাবধানে চলা এই পুজোয় গাজিপুরের লাল-চিনির নৈবেদ্যের মতোই উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রবীণ ও নবীনের মিলনমেলা। বর্তমান বংশধর উজ্বল হালদার বলেন, ‘কর্মসূত্রে বাইরে থাকা পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে আশেপাশের অঞ্চলের মানুষরা পূজার চারদিন এক হয়ে ওঠেন। শনিবার সপ্তমীর সকালে ঘটভরা থেকেই গ্রামবাসীদের ঠিকনা হয়ে উঠেছে হালদার বাড়ি। এখানে মহানবমীর পূজার পর সিঁদুর খেলার চল রয়েছে।’ সেইসঙ্গে ঢাকের বিষাদের সুরে আগামী বছরের দিন গোনা শুরুর সঙ্গেই উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর থেকে আসা লাল-চিনির এই ঐতিহ্যবাহী নিবেদন হালদার বাড়ির পুজোর পাতাকে করে তোলে আরও বেশি বর্ণময়।



