প্রদীপ আচার্য: স্কুলে যাওয়ার পথে আচমকা ব্যাপারটা দেখে চোখটা চিরিক করে ওঠে সায়নের। মনটা খুবই চঞ্চল হয়ে যায় তার। তুঁতেপাড়ার মেঠো পথ ধরে দলবেঁধে স্কুলে যায় ওরা। সবাই খুব হই-হুল্লোড়, হাসি, মজায় মেতে থাকে এই সময়। সেই সুযোগে ইচ্ছে করেই ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে সায়ন। জুতোর ফিতে বাঁধার অছিলায় সে রাস্তায় উবু হয়ে বসে পড়ে। তাছাড়া তার পা দুটোও আর চলতে চাইছে না। সে যা দেখেছে, সেই পিছুটানে সে আর এক পা-ও এগতে পারবে না। সায়ন সবার অলক্ষ্যে অনেকটাই পিছনে থেকে ক্রমশ দূরত্ব বাড়িয়ে নেয়। ওর স্কুলের বন্ধুরা টেরই পায় না যে, সায়ন ওদের দলছুট হয়ে গেছে। সায়ন উঠে দাঁড়ায়। ওর বন্ধুরা মণ্ডলদের পুকুরের দিকে বাঁক নিতেই পিটটান দেয় সে। এক ছুট্টে চলে আসে কাবাসীদের সেই জমির কাছে। এই খোলামেলা জমির ধার ঘেঁষেই মেঠোপথে সায়নদের স্কুল। সকালেই হয়তো জন খাটিয়ে জমির কিছুটা জায়গা কোদালে কোপানো হয়েছে। কোনো শাকসবজির চাষবাস হবে হয়তো। সেই কোদালের ঘায়ে এটা উঠে এসেছে। তবে কোদালের ঘা পড়েনি এতে। এই যা রক্ষে। সায়ন প্রায় ছোঁ মেরে ওটাকে হাতে তুলে নিয়েই দে ছুট। একছুট্টে বাড়ি পৌঁছে যায়।
বাড়ির পিছন দিকের বেড়া-লতার গেট খুলে ঢোকে সায়ন। তারপর খুব সন্তর্পণে পথে কুড়িয়ে পাওয়া পরম ধনকে গাছলতাপাতার ঝোপে লুকিয়ে রাখে। ঘুরপথে সামনের গেট খুলে এবার ভালোমানুষের মতো বাড়িতে ঢোকে সে।
স্কুল না গিয়ে ছেলেকে বাড়ি ফিরে আসতে দেখে সায়নের মা মৌসুমী দেবী হাঁ হয়ে গেলেন। রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। চোখ কপালে তুলে তিনি বললেন, ‘ও মা তুই ফিরে এলি যে! স্কুলে গেলি না?’ সায়ন কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। স্কুলের ব্যাগ নামিয়ে রেখে বিছানায় বসে পড়ে। শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢোকেন মৌসুমী দেবী। ছেলের মুখে জবাব না পেয়ে উদ্বিগ্ন হন তিনি। ছেলের কপালে গলায় হাত রাখেন। তাপমাত্রা মাপার চেষ্টা করেন। বলেন, ‘কী রে স্কুলে না গিয়ে ফিরে এলি যে! পুজোর আগে জ্বর-টর বাঁধালি নাকি? নাকি পেটে ব্যথা? কীরে কী হল বলবি তো?’ সায়ন গম্ভীর স্বরে বলে, ‘না, ওসব কিছু না?’
‘তাহলে কীসব কিছু? কারও সঙ্গে ঝগড়া করেছিস নিশ্চয়ই?’
‘না, ঝগড়া করব কেন? তুমি আমায় দেখেছ কখনো ঝগড়া করতে?’
‘না, তা অবশ্য দেখিনি। তাহলে কী এমন হল? ফিরে এলি যে? স্কুল কি ছুটি হয়ে গেল? কই ও বাড়ির রন্টু, মিন্টুদের তো সাড়া পাচ্ছি না? ওরা তো বাড়ি আসেনি। তাহলে তুই...’
‘রন্টু, মিন্টু ওরা তো স্কুলে গেছে। আমি যাইনি।’
‘কেন যাসনি? স্কুলে না গিয়ে ফিরে এলি কেন? জ্বরজারি নেই, পেটে ব্যথা নেই, কারও সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি, মনকষাকষি নেই, অবাক কাণ্ড!’
‘অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি আজ স্কুল ছুটি নিয়েছি।’
‘ছুটি নিয়েছিস মানে? এ কি তোর অফিস যে সিএল নিবি। ছুটি দেয় স্কুল। নেয় আবার কে? একদিন স্কুলে যেতে পারলি না, পরদিন তোর বাবা দরখাস্ত লিখে দেয় ছুটি মঞ্জুর হওয়ার জন্য। আর তুই স্কুলে রওনা হলি, মাঝপথে ফিরে এলি! বলছিস আজ স্কুল ছুটি নিয়েছিস! সাত জম্মেও শুনিনি এমন বেয়াড়া কথাবাত্তা। দু’বছর পরে মাধ্যমিক দিবি, একদিন স্কুলে না গেলে
কত ক্ষতি জানিস সেটা?’
‘জানি। ও আমি ঠিক পুষিয়ে নেব।’
‘তার মানে তুই ক্লাসের ফার্স্ট বয় হয়ে এর তার কাছে গিয়ে হাত পাতবি। তাই তো?’
‘মা, তুমিই তো বল যে, ক্লাসের ফার্স্ট বয় বলে ভেব না তুমি বড়ো দিগগজ হয়ে গেছ। বল না তুমি? আমি যদিও মনেই করি না আমার দুটো পাখনা গজিয়েছে। বরং আমি উলটোটাই করি। ক্লাসের অগামারা যাদের বলা হয়, আমি তাদের সঙ্গেই বেশি মেলামেশা করি। ওই তাপস, সুভাষ ওদের একটু অঙ্কটঙ্ক বুঝিয়ে দিই, পড়া বলে দিই, ওরা আমাকে মাথায় তুলে নাচে। ওরাই আমার প্রকৃত বন্ধু। ওরা অন্তত, পরীক্ষার আগের দিন এটা করছিস? ওটা করিসনি? সেকি রে! এসব বলে আমায় ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করে না।’
‘লেকচার ছেড়ে এবার বল আমাকে তুই স্কুলে ছুটি নিলি কেন? নিজের ইচ্ছেয় স্কুলে না গিয়ে ছুটি নেওয়া! কখনো শুনিনি এমন সৃষ্টিছাড়া কথা।’
‘এটা আমার পার্সোনাল ম্যাটার।’
‘কী? এই বয়সেই তোমার পার্সোনাল ম্যাটার? ধরণি দ্বিধা হও। ছেলে এখন লায়েক হয়েছে। মায়ের কাছে কথা লুকতে শিখেছে। হায় ভগবান, হায়রে আমার পোড়াকপাল!’
‘মা, তুমি উলটো বুঝো না। আমি কোন কথাটা তোমাকে লুকিয়েছি বল?’
‘তাহলে স্কুল না গিয়ে বাড়ি ফিরে এলি কেন? আমাকে জানতে হবে না সেটা?’
‘তোমাকে এখন বলা যাবে না। ও তুমি বুঝবে না।’
‘বুঝব না মানে? কী এমন হাতিঘোড়া-বজরাপানসি ব্যাপার শুনি যে বুঝব না?’
সায়ন আর কথা বাড়ায় না। সে চুপ করে যায়। ছেলেকে গুম মেরে বসে থাকতে দেখে মৌসুমী দেবী চোখ পাকিয়ে ধমকের সুরে বলেন, ‘আজ বাড়ি আসুক তোর বাবা। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।’ ঘর থেকে বেরিয়ে গজর গজর করতে করতে উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকে পড়েন। সকালে অফিসের ভাত কোনো রকমে নাকে মুখে গুঁজে ট্রেন ধরতে ছোটেন সায়নের বাবা বিপুলবাবু। সায়নও ডাল, আলুভাজা, বেগুনভাজা দিয়ে ভাত খেয়ে ছোটে স্কুলে। আসল রান্নাটা মা নিটিরপিটির করে ধীরে সুস্থে রাঁধেন। সায়ন বেলায় স্কুল থেকে ফিরে এসে খায়। আর ওর বাবা তরিবত করে খান রাতের বেলায়।
সায়ন ভাবে, মা রান্না সেরে স্নানে যাবে। তখন অনেকটা সময় হাতে পাওয়া যাবে। সেই মওকায় কাজ সারতে হবে। সায়ন এক অপার উত্তেজনায় ফুটতে থাকে। আজ সে যা করতে যাচ্ছে, মাকে সেকথা জানতে দেওয়া যাবে না। মা জানতে পারলে সব ভেস্তে যেতে পারে। সব গুবলেট করে দিতে পারে মা। বলতে পারে হায়রে কপাল আমার! এজন্য তুই স্কুল কামাই করলি! স্কুল কামাই করে এসব...আজ আসুক তোর বাবা, বাড়িতে এসব আবর্জনা বয়ে আনা? ফেলে দে, ফেলে দে বলছি। যা হাত-পা ধুয়ে ঘরে ওঠগে যা। যা বলছি...মায়ের এসব বুলি সায়নের মুখস্থ। তাই মাকে জানতে দেওয়া যাবে না। গোপনে খুব নীরবে কাজ সারতে হবে। তাছাড়া অতীনস্যার বলেছেন, যে কোনো মহৎ কাজ করতে হয় নীরবে। সুতরাং সায়ন তাই করবে।
স্কুলের ভূগোলের টিচার অতীনস্যার সায়নকে ভীষণ ভালোবাসেন। সায়নদের পাশের পাড়াতেই স্যার থাকেন। গত শনিবার স্কুল ছুটির পরে অতীনস্যার এসে সায়নের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘চল, আজ একটু দরকারে তোদের পাড়াটা ঘুরে বাড়ি যাব।’ সায়ন হেসে বলে, ‘চলুন স্যার আমাদের বাড়িতেও যেতে হবে।’
‘আজ নয়। অন্য একদিন যাব তোদের বাড়িতে। শোন সায়ন, ভালোই হল। যেতে যেতে তোকে একটা কথা বলি, ক্লাসের ফার্স্ট বয় বলে নয়। তোর মধ্যে একটা দরদি মন আছে। তাই তোকে একটা কথা বলব। মেনে চলার চেষ্টা করিস। তুই বলেই বলছি। আমি মনে করি, তুই কথার মর্মটা উপলব্ধি করতে পারবি। এটা আমার বিশ্বাস। বুঝলি?’ সায়ন সলাজ হেসে বলে, ‘আপনি বলুন স্যার?’ অতীনবাবু সায়নের কাঁধে হাত রেখেই হাঁটছিলেন। বললেন, ‘সায়ন, রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নিবি, আজ আমি কমপক্ষে পাঁচটা ভালো কাজ করব। দিনের শেষে দেখা গেল যে, পাঁচটা কেন, একটাও ভালো কাজ করার সুযোগ তুই পাসনি। কিন্তু, ভালো কাজ করার ভাবনা যেহেতু তোর মাথায় রয়েছে, তাই একটা খারাপ কাজও তোর দ্বারা হয়নি। আমি যা বললাম, মেনে চলার চেষ্টা করিস, তাহলে দেখবি তুই একাই একশো হতে পারবি।’
রোববার সকালে সায়ন ওর বাবাকে কথাটা বলল। শুনে বিপুলবাবু বললেন, ‘বাহ! চমৎকার বলেছেন তো! সত্যি সত্যিই যদি ওঁর এই কথার মর্ম সবাই ঠিক মতো অনুধাবন করতে পারত, তাহলে পৃথিবীটা আরও অনেক সুন্দর, আরও মনোরম হয়ে যেত।’
সায়ন বারান্দার চেয়ারে শান্ত বালকের মতো ধীর স্থির হয়ে বসে থাকে। আর সময় গুনতে থাকে মা কখন রান্না সেরে বাথরুমে ঢুকবে।
মৌসুমী দেবী বার দুই রান্নাঘর থেকে উঠোন পেরিয়ে দালানঘরে এলেন। আড়চোখে সায়নের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। তাঁর চোখের ভাষা হল, আজ আসতে দে তোর বাবাকে। সায়ন জানে, সে একবার গিয়ে পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরলেই সব ঠান্ডা। মায়ের যত রাগ দেখানো ওই মুখেই। কিন্তু তবুও ভরসা নেই। কাজের কাজটা না আখেরে পণ্ড হয়ে যায়। তাই মায়ের অগোচরেই কাজ সারতে হবে।
অতীনস্যার বলেন, ‘কাজ করতে হয় নীরবে। আর মহৎ কাজ আরও নীরবে করে ফেলতে হয়। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানান দিয়ে যে কাজ হয়, তা দেখতে বা শুনতে মহৎ কাজ হলেও তার পেছনে কোনো না কোনো স্বার্থ বা অভিসন্ধি থাকে।’ তাই সায়ন ভাবে, তার কাজটা যখন মহৎ, তখন তা নীরবেই সেরে ফেলতে হবে।
সত্যি সত্যিই খুবই নীরবে ও নির্বিঘ্নে কাজটা সেরে ফেলেছে সায়ন। এখন তার আর কোনো টেনশন নেই। ভেতরটা তার আনন্দে ভরে আছে এখন। তার ভেতরটা এখন পাখির পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে। সে যেন এখন ইচ্ছে করলে পাখনা মেলে উড়েও যেতে পারে। কালই স্কুলে গিয়ে সায়ন অতীনস্যারকে প্রণাম করে বলবে, স্যার আমি গতকাল একটা ভালো কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।
সায়ন খেয়েদেয়ে বাধ্য ছেলের মতো মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। মৌসুমী দেবী কপট রাগ দেখান। বলেন, ‘ছাড়, ছাড় আমাকে ছাড়। উনি এখন বড়ো হয়ে গেছেন। ওর এখন পার্সোনাল ম্যাটার হয়েছে, মাকে আর কী দরকার?’ সায়ন চুপটি করে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দেয়। সে একটু ঘুমিয়েও পড়েছিল। আচমকা অতীনস্যারের ডাকে ঘুম চটকে যায় তার। মৌসুমী দেবী বলেন, ‘তোর স্যার এসেছেন। যা ওঁকে বসার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসা, আমি যাচ্ছি।’
সায়নকে দেখে অতীনস্যার বলেন, ‘কী ব্যাপার রে তোর? শুনলাম, তুই অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে উধাও হয়ে গেছিস। ক্লাসে তোকে না দেখে খোঁজ করতেই শ্যামল, সুতনু ওরা সব বলল, তুই নাকি মাঝরাস্তা থেকেই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছিস। আমি তো চিন্তায় পড়ে গেলাম। কী হল ছেলেটার?’
‘জিজ্ঞেস করবেন না স্যার ওটা ওর পার্সোনাল ম্যাটার। বাবু এখনই দিগগজ হয়ে গেছেন।’ বলতে বলতে মৌসুমী দেবী বসার ঘরে এলেন। বললেন, ‘স্কুলে না গিয়ে ফিরে এল ছেলে, কেন? কী বেত্তান্ত কিছুই বলে না। বলছে, ও নাকি আজ ছুটি নিয়েছে।’ অতীনস্যার বললেন, ‘তাই নাকি? ছুটি নিয়েছিস? তা কীসের ছুটি?
সায়ন বেশ গর্বের সঙ্গে বলল, ‘বৃক্ষরোপণের ছুটি স্যার।’
‘বৃক্ষরোপণ? তা কোথায় বৃক্ষরোপণ করলি?’
‘এই তো আমাদের পেছনের জমিতে। আপনি আসুন স্যার। আপনাকে দেখাই।’ অতীনস্যারকে সায়ন ওদের ঘরদালানের পিছনের জমিতে নিয়ে গেল। মৌসুমী দেবীও গেলেন পেছন পেছন। সায়ন একটা ছোট্ট চারাগাছকে দেখিয়ে বলল, ‘কাবাসীদের জমি কুপিয়েছে। শেকড়ের মাটিশুদ্ধু এই চারাগাছটা উপড়ে গেছে। আমি এটাকে তুলে এনে পুঁতেছি। স্কুলছুটি পর্যন্ত অপেক্ষা করলে গাছটা হয়তো এই চড়া রোদে শুকিয়ে মরেই যেত।’
‘কী গাছ এটা? জানো?’
‘না স্যার, তা জানি না। তবে গাছ তো। আপনিই তো বলেন স্যার গাছগাছালির যত্ন নিতে হয়। একটি গাছ একটি প্রাণ।’