


সঞ্জীবকুমার দে: এবার ভয় পেয়ে গেলেন বটুবাবু। সার সার বীভৎস মুখাবয়ব! কোনওটার চোখের পাতা নেই, তো কোনওটার চোখই নেই! কোনওটার নাক নেই তো যেটার আছে সেটা বিকট! কোনওটার কান ঝুলে পড়েছে। কোনওটা পুরোপুরি ন্যাড়া! আবার যেটার চুল আছে তো যেন মৃত কোনও প্রাচীন বটের শুকিয়ে যাওয়া ঝুরি! বেশিক্ষণ চেয়ে থাকাই মুশকিল!
নিছক একটা কৌতূহলে অনলাইন-সেল কাম ডেলিভারি সংস্থার একটা অ্যাপে মোবাইল থেকে ‘ভূত’ লিখে সার্চ দিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। সর্বনাশ! এরা ভূতও বেচে!
আগ্রহ বাড়ল। মোবাইলের ওপর আর একটু ঝুঁকে জমিয়ে বসলেন বটুবাবু। সব ছবির নীচেই যার যার মূল্য লেখা আছে। এরা পয়সা পেলেই দরজায় পৌঁছে দেবে ভূত! এও সম্ভব?
দেখতে দেখতে একটা ভয়ঙ্কর মুখের ওপর ক্লিক করে ফেললেন তিনি। বিস্তারিত দেখার জন্য। দাম ছাড়-টাড় দিয়ে আড়াই হাজার টাকা। শিপিং চার্জ নির্ধারণের জন্য লোকেশন আর পিনকোড জানতে চাইছে সংস্থা। বটুবাবু লিখলেন। ওরা দেখাল চারদিনের মধ্যে ডেলিভারি। আর শিপিং চার্জ দু’শো টাকা। তা তো হবেই। একটা আস্ত ভূতকে এনে পৌঁছে দেবে দরজায়। এ কি চাট্টিখানি কথা!
কৌতূহল মিটিয়ে সাইট থেকে বেরিয়ে এলেন বটুবাবু। জীবনে কতরকমের অভিজ্ঞতা! কত কী ঘটে যাচ্ছে দুনিয়ায়! কত পরিবর্তন! এখন ডিজিটাল দুনিয়া।
আসলে ব্যাপারটা হল বাড়িতে এখন লাগাতার অনলাইনে কেনাকাটা। এই বড়বউমা বিছানার চাদর আনাচ্ছে তো ছোটবউমা আনিয়ে নিচ্ছে দরজা-জানলার পর্দা। মেজছেলের পাঞ্জাবি পাতলুন এল তো বড়ছেলের দাড়িকাটার সাবান, ব্লেড। নাতির জুতো এল তো নাতনির স্কুলব্যাগ। রোজই কিছু না কিছুর অর্ডার, আর ডেলিভারি। এখন তো ডাল-চাল-তেল, মশলাপাতি, এমনকী মাছ পর্যন্ত অনলাইনে আনাচ্ছেন বাড়ির কর্ত্রী খোদ বিন্দুবাসিনী! এসব দেখেটেখে কি সাধ হতে নেই?
সেই সাধেই চুপিচুপি সকলের অগোচরে বটুবাবুর এই প্রয়াস। প্রথম প্রয়াস। মাসখানেক আগে জন্মদিনে ছোটছেলের কাছ থেকে এই অ্যান্ড্রয়েড ফোনটি উপহার পেয়েছেন তিনি। ফোনটি বাবার হাতে দিয়ে একেবারে চমকে দিয়েছে টর্পেডো।
উপহারে আপ্লুত বটুবাবু লজ্জা লজ্জা ভাব করে সংশয় প্রকাশ করেছেন, ‘আরে! আমি কি ওসব পারব?’
‘পারবেন না মানে!’ জোর গলায় বলেছে বড়বউমা, ‘আমরা সবাই মিলে আপনাকে রপ্ত করিয়ে দেব।’
‘হ্যাঁ দাদু, কোনও চিন্তা কর না! এটা শেখা কোনও ব্যাপারই নয়! ঘাঁটতে ঘাঁটতে তুমি কয়েকদিনেই অভ্যাস করে ফেলবে।’ প্রায় সমস্বরে হইহই করে বলে উঠেছিল দশ বছরের নাতনি আর বারো বছর বয়সের নাতি।
তখন থেকেই তারা মাস্টারিতে লেগে পড়েছিল দাদুর মতো শান্তশিষ্ট মনোযোগী ছাত্রটিকে পেয়ে।
এটা মাসখানেক আগের কথা। এই মাসখানেকে বটুবাবু রপ্ত করে নিয়েছেন অনেকটাই। তিনি মেসেজ লিখে পাঠাতে পারেন। ভিডিও কল করতে পারেন। অনলাইন ব্যাঙ্কিং পারেন। সিনেমা, সিরিয়াল খুলে দেখতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন। তবে অন্যদের থেকে বারবার দেখে শিখে, কেনাকাটার সাইটে ঢুকে নিজে নিজে সার্চ করাটা করেছেন আজই প্রথম। উদ্দেশ্য, কিছু একটা কিনে হঠাৎ করে চমকে দেবেন সকলকে। সেই সার্চ করতে গিয়েই কী করেন, কী করেন, ‘ভূত’ লিখে সার্চ করে ফেলেছেন!
সাইট থেকে বেরিয়ে এটা সেটা কী যেন করছিলেন বটুবাবু! মিনিট পাঁচেক হবে বড়জোর। তারপরই ফোন বাজল অজানা কোন নম্বর থেকে। ধরলেন। ও প্রান্ত থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠস্বর— ‘স্যার, আপনি আমাদের সাইট সার্চ করছিলেন? যেটা সার্চ করছিলেন, সেটা নিতে কি আপনি আগ্রহী?’
বটুবাবু আমতা আমতা করে বললেন, ‘হ্যাঁ, মানে আমি ভূত সার্চ করছিলাম।’
—এগজ্যাক্টলি। আপনি কি স্যার সেটা নেবেন?
—মানে আমি কৌতূহলবশত দেখছিলাম আর কী!
—নিশ্চয়ই দেখবেন স্যার! বাছবেন, পছন্দ করবেন। এসব সামগ্রী তো কেনার জন্যই দেখবেন।
বলেই জিজ্ঞাসা করে বসল, ‘আপনার গুডনেমটা কী স্যার? বলুন না, প্লিজ।’
বটুবাবু বলব না বলব না ভেবেও বলে ফেললেন।
—কাইন্ডলি পোস্টাল অ্যাড্র্রেসটা যদি বলেন!
বটুবাবু সেটাও বললেন। মেয়েটি খুবই নম্রভাবে কথা বলছে। এবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কোনটা নেবেন, সেটা কি নির্বাচন করেছেন স্যার?’
—না, মানে আমি আদৌ নেব কি না এখনও মনস্থ করিনি।
—ঠিক আছে স্যার। তবে যদি কিনব ঠিক করেন, তবে আমাদের সাইটে গিয়ে বেছে অর্ডার প্লেস করে দেবেন স্যার! আমরা অপেক্ষায় থাকব।
‘আচ্ছা।’ বটুবাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
সেদিনের মতো রেহাই মিলল বটে, কিন্তু পরদিন থেকে এমন ফোন শুরু হল যে ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি অবস্থা! দিনে অন্তত সাত-আটবার। অনুরোধের পর অনুরোধ— ‘অর্ডার করুন স্যার! আমরা অপেক্ষায়।’
প্রথম প্রথম ফোন রিসিভ করছিলেন বটুবাবু। বিরক্ত হয়ে পরে আর ধরছিলেন না। তাতেও এক বিপদ! এর মধ্যে ঢুকে পড়লেন বিন্দুবাসিনী— ‘ব্যাপার কী? ফোন বেজে যাচ্ছে, ধরছ না কেন? কোথায় কী কাণ্ড বাঁধিয়েছ?’
রাগে ফেটে পড়তে গিয়েও নিজেকে সামলালেন বটুবাবু। ঠিক করলেন, নাহ, মায়া-দয়া দেখাবেন না। ভূত কিনেই ছাড়বেন! বিকট ভয়াল এক মারকুটে ভূত! সেই ভূত এনে আর কাউকে নয়, শায়েস্তা করে ছাড়বেন বিন্দুবাসিনীকে।
শেষ পর্যন্ত একটা বিকট ভূত পছন্দ করে সেটার অর্ডার প্লেস করে দিলেন বটুবাবু। ক্যাশ অন ডেলিভারি।
অর্ডার কনফার্মড। ওদিক থেকে জানাল। চারদিনের মধ্যে দরজায় পৌঁছে যাবে ভূত!
তিনদিনের দিন দুপুরের দিকে জিনিসটা এসে পৌঁছল বটুবাবুর বাড়ির গেটে। ছেলেরা তো তাদের কাজে। বউমারা যে যার ঘরে বিশ্রামে। নাতি-নাতনি দু’টি স্কুলে। বটুপত্নী তাঁর দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রায়। সকালে ডেলিভারিম্যান ফোন করতেই তাঁকে লোকেশনটা বুঝিয়ে দিয়ে বেলাদুপুরে ডেলিভারি দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বটুবাবু। অনুরোধ করেছিলেন গেটে বেল না বাজিয়ে, তাঁকে ফোন করে ডাকতে। ছেলেটি কথা রেখেছে।
হিসাবমতো টাকা বুঝিয়ে দিয়ে চুপিসারে পার্সেল ডেলিভারি নিলেন বটুবাবু। মস্তবড় প্যাকেট। তবে হালকা একেবারে! তা তো হবেই। ভূতের কি ওজন থাকে? হাতে নিয়ে গা ছমছম করে উঠল। ভয় করছে একটু। আচ্ছা সত্যি ভূত আছে তো ভিতরে?
দোতলায় উঠে চুপিচুপি একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজে সেখানে প্যাকেটটা রেখে দিলেন তিনি। ঠাকুরঘরের উপরে, বাঙ্কে।
আরও দু’দিন কেটে গেল। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না বটুবাবু। রাতে ঘুম নেই চোখে। দিনে উসখুস করছেন। ঠাকুরঘরের দিকে যাতায়াত করছেন বারবার। প্যাকেট খুলবেন কি খুলবেন না, খুললে কখন খুলবেন, কিছুই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
এমন চললে কারও চোখে ধরা পড়বেন না? পড়লেন। আর পড়লেন তো সেই তাঁর মোক্ষম প্রতিপক্ষ বিন্দুবাসিনী দেবীর চোখেই।
‘আমি ছেলেদের ডাকছি।’ কোনও ভূমিকা না করে সরাসরি ঘোষণা বটুগিন্নির।
চমকালেন বটুবাবু, ‘ডাকবে মানে! কী জন্য? কী হয়েছে?’
‘কী হয়েছে, সেটা তুমি বলবে। আগে সকলকে ডাকি।’ বলেই গলা চড়িয়ে তিন ছেলে, দুই বউমাকে হাঁক পেড়ে ডেকে আনলেন বিন্দুবাসিনী। নাতি-নাতনি দু’টিকে ডাকতে হল না, তারা ঘটনা কিছু গুরুতর অনুমান করে নিজেরাই এসে হাজির।
বটুবাবু কুঁকড়ে বসে। বটুগিন্নি ঝানু গোয়েন্দার মতো গোপন পর্যবেক্ষণে যা দেখেছেন তা বিস্তারিত সকলের সামনে পেশ করলেন— ‘ওই প্যাকেটটা সম্ভবত অনলাইনে অর্ডার করে আনিয়েছে তোদের বাবা। লুকিয়ে ওখানে তুলে রেখেছে। ক’দিন হল আনচান আনচান করছে। রাতে ঘুমাচ্ছে না। তোরা এর কারণটা কী জানবার চেষ্টা কর। কী আছে ওই বাক্সে যে খুলতে এত দ্বিধা? বোমা, বিস্ফোরক, নাকি বাঁদর-ভালুক? জেনে নে।’
সকলে থ! দৃষ্টিতে কৌতূহল। জিজ্ঞাসা।
এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন বটুবাবু— ‘ওটাতে ভূত আছে একটা! বড় সাংঘাতিক, ভয়ঙ্কর এক ভূত! তোদের মাকে জব্দ করার জন্য আনিয়েছি।’
‘ভূত!’— সত্যি সত্যিই যেন বোমা ফাটল ঘরে। হুড়োহুড়ি, হইহই, সে ভয়ঙ্কর অবস্থা! বটুগিন্নি ধড়াস করে বসে পড়লেন সোফায়। তাঁর কথা আটকে গেল!
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। কে কী বলবে বুঝতে পারছে না।
বটুবাবুই স্তব্ধতা ভাঙলেন, ‘আনিয়েছি বটে! তবে আমিও খুলতে সাহস পাচ্ছি না!’
‘বাক্স নামাও, আমি খুলব। দেখি তোমার কেমন ভূত!’ বলল চটপটে নাতিবাবু।
মেজোছেলে রকেট বাক্স নামাল। নাতিবাবু প্যাকেট জরিপ করে ছুটে গিয়ে একটা ছুরি নিয়ে এলো। নাতনি সাহস জোগাল সকলকে– ‘কোনও ভয় নেই। ভূতই ভয় পেয়ে যাবে এত লোক দেখে।’
কিন্তু তা বললে কী হয়! সাহস কি সবার সমান? পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে মেজো বউমা। বড়ছেলেও। বিন্দুবাসিনী জল চেয়ে খেলেন। কাত মেরে আছেন বটুবাবু স্বয়ং।
প্যাকেট কাটা হল। মোড়কের পর মোড়ক। খুলতে খুলতে সমাপ্ত সব আবরণ। অতি সন্তর্পণে নাতিবাবু হাতে তুলে বের করে আনল যা, সেটা ভূত নয়, ভয়াল, বীভৎস, কিন্তু নিপুণ, একটা ভূতের মুখোশ!
হঠাৎ দেখলে ভয় পেয়ে যাওয়ার কথাই, কিন্তু সকলের চোখেমুখে একই রকম মুগ্ধতা, কণ্ঠ থেকে একসঙ্গে বেরল— ‘বাহ!’
নাতনি জানতে চাইল, ‘এই মুখোশ দিয়েই তুমি ঠাম্মিকে ভয় দেখাবে ভেবেছিলে দাদু?’
নাতি মুখোশে মাথা গলিয়ে ঠাম্মার মুখের সামনে ঝুঁকে আওয়াজ দিল– ‘হুম!’
বিন্দুবাসিনী গা ঝাড়া দিয়ে উঠে গটগটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
বটুবাবু কী করে বলেন যে, বড় ঠকাই ঠকে গিয়েছেন তিনি! ভূত চেয়ে পেয়েছেন ভূতের মুখোশ! তাঁর বরাতটাই এমন!
অঙ্কন ও অলঙ্করণ: সুমনকুমার সিংহ