ভ্রম থেকে সুকুমার রায়ের বর্ণময় ক্যানভাসে একাকার কলকাতা, থিমের সঙ্গে সাবেকিয়ানার ফিউশন
  • ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শহরের নানা প্রান্তে থিমের ছড়াছড়ি। একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার পালা। তবে এই থিম পুজোকে ঘিরে রয়েছে অনেক জানাঅজানা কাহিনি।

Advertisement

বিধান পার্ক সংস্কৃতি পরিষদ। পুজো পরিচালনায় আবাসিকদের নিয়ে গড়ে ওঠা বিধান পার্ক পুজো কমিটির দেবী আবাহন এবার ৫৪ বছরের পড়ল। আবাসিকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ফলে আলাদা উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। পুজোকে মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান ছাড়াও সপ্তমী আর নবমীর দুপুরে থাকছে প্রীতি ভোজ। পুজোর যেমন একাল সেকাল রয়েছে, ঠিক তেমনই যাকে কেন্দ্র করে মায়ের মণ্ডপ গড়ে ওঠে, সেই বাঁশের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ আছে। রাজেন্দ্রলাল স্ট্রিট সাধারণ দুর্গোৎসব কমিটি এই ভাবনাকে সামনে রেখেই তাদের মণ্ডপ  সাজিয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে পুজোর আদি বৃত্তান্ত। তারমধ্যে শৈল্পিক আধুনিকতা। মাতৃ প্রতিমা ২৫ ফুটের। এই পুজোর বয়স ৮৩ বছর। 
আদি এবং নব্যের অবিশ্বাস্য মেলবন্ধনে এবার তাক লাগাতে তৈরি চারু অ্যাভিনিউ নবপল্লি সংঘ। তাদের থিম ইলিউশন। ভ্রম। তারা ভ্রম তৈরি করেছে মণ্ডপে। যতদূর চোখ যাবে, যা যা দেখবেন, দেখার পর আপনার মনে যে ধারণা তৈরি হবে, তা আসলে আপনার ভ্রম। মানুষের চোখে সমাজের চোখে সবথেকে বড়ো ভ্রম কারও বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্স এবং স্টেটাস। আমাদের ধারণা, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দৌড়ে আর কানে মোবাইল গুঁজে আমরা এগুলি অর্জন করেছি। মানে এগুলিই আমাদের জীবনের অ্যাচিভমেন্ট। ভুল। এই ভুলের পিছনে দৌড়ে আমরাই জীবনের ছোটো ছোটো সুখ-শান্তি, ভালোলাগা, ভালোবাসা, সূক্ষ্ম অনুভূতিকে জলাঞ্জলি দিয়েছি। এইসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিকে থিমের মোড়কে পুজো মণ্ডপে তুলে ধরা সহজ কথা নয়। তাই কুর্নিশ জানাতে হয় সন্দীপ এবং তাপসী মুখোপাধ্যায়ের এবারের শিল্প ভাবনাকে।
বদলের বাংলায় মণীষীদের নতুন করে সম্মান এবং শ্রদ্ধা জানানোর পালা। আমাদের মনে শৈশবকে ফিরিয়ে আনার অন্যতম কারিগর সুকুমার রায়। তাঁর আবোল তাবোল আজও আমাদের মনের মণিকোঠায় সযত্নে বসবাস করে। নস্টালজিয়া। সেই ব্যক্তি, যিনি এক নিমেষে আমাদের ৫০ বছর বয়স কমিয়ে দিতে পারেন, তিনিই সুকুমার রায়। আধুনিক প্রজন্ম কি সুকুমার রায় বা তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি বাবুরাম সাপুড়ে, কুমড়ো পটাশ বা হুঁকোমুখো হ্যাংলাকে চেনে? যদি না চেনে, অন্তত একবার ঢুঁ মারতে হবে পূর্ব পুঁটিয়ারি প্রগতি সংঘের পুজো মণ্ডপে। শিল্পী সোমনাথ দাস পুজোর ৭২ তম বর্ষে সুকুমার রায়ের এক বর্ণময় ক্যানভাস তৈরি করেছেন। বইয়ের পাতা থেকে চরিত্রগুলি উঠে এসেছে চোখের সামনে। শুধু শ্রদ্ধাজ্ঞাপন নয়, সুকুমার রায়ের একের পর এক ব্যাঙ্গাত্মক চরিত্র আসলে আমাদের মনের আয়না। তাই থিমের নাম ‘গপ্পো আর গপ্পো’।
মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছাপ্রকাশকে সম্মান জানিয়ে সাবেকিয়ানায় ফিরছে আনোয়ার শাহ রোড উদয়ন সংঘ। মায়ের পুজো শিল্পের নামে পালটাতে পালটাতে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্পের প্রদর্শন বা এগজিবিশন। সেখানে প্রাণের পুজোটাই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ এখনও বনেদি বাড়ির দুর্গা দালানে মায়ের শান্ত, স্নিগ্ধ, ভুবনমোহিনী রূপ আমাদের এতটাই বিমোহিত করে, আমরা বন্ধুবান্ধবের কাছে খোঁজ নিই তাঁদের বাড়িতে পুজো হয় কি না। তাদের খোঁজ এবার শেষ হবে আনোয়ার শাহ রোডের উদয়ন সংঘে। সেই পুরানো ভাবনাকে আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে দাঁড় করিয়ে দিলে কেমন হয়? অনেকটা ফিউশন সংগীতের মূর্ছনার মতো। যদি একই পুজোয় কাজ করেন থিম শিল্পী সোমনাথ মুখোপাধ্যায় এবং সেই পুজোয় প্রতিমা গড়েন সব হিসাব পালটে দেওয়া শিল্পী সনাতন দিন্দা? সনাতনী সোমনাথ বনাম খোদ সনাতন। এই ডুয়েল দেখার লোভ সামলানো সত্যিই মুশকিল হবে দর্শনার্থীদের।