দিব্যেন্দু বিশ্বাস, নয়াদিল্লি: বদলেছে সময়। বদলেছে চরিত্র। সুদৃশ্য বাড়ি ছেড়ে ক্রমেই ফ্ল্যাট বা বহুতলে অভ্যস্ত হচ্ছে দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্ক (সিআর পার্ক)। অর্থাৎ, যা ছিল চিরন্তন-সাবেকি, ক্রমশই সেই জায়গা নিচ্ছে আধুনিকতা। এহেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও পুজো আয়োজনে কোনো পরিবর্তন আসতে দেননি দিল্লির এই অন্যতম বাঙালি পাড়ার বাসিন্দারা। আর তাই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে টেরাকোটার মন্দিরের আদলে তৈরি হয়েছে প্যান্ডেল। কোথাও আবার জামদানি শাড়ি দিয়ে চলছে মণ্ডপসজ্জা। সৃজনশীলতায় একে অপরকে টেক্কা দিতে তৈরি চিত্তরঞ্জন পার্কের উদ্যোক্তারা। পঞ্চমীতেই সি আর পার্কের অধিকাংশ পুজোর উদ্বোধন হয়ে গিয়েছে। যদিও ‘ফিনিশিং টাচ’ দেওয়া বাকি।
গত বছর সিআর পার্কের তিনটি পুজোর ৫০ বছর পূর্তি ছিল। ৫১তম বর্ষেও জাঁকজমক বজায় রেখেছে তারা। সিআর পার্ক বি ব্লকের পুজোয় এবার উঠে এসেছে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। কমিটির সহ সভাপতি গোপা বসু বলেন, ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রাণের ঠাকুর। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে কোনো বিশেষ উপলক্ষ্যের প্রয়োজন পড়ে না। তবে মণ্ডপসজ্জায় এমন অভিনবত্ব অন্য কোথাও পাবেন বলে মনে হয় না। আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও রবীন্দ্র-ভাবনার ছোঁয়া রয়েছে।’
সিআর পার্ক কো-অপারেটিভ গ্রাউন্ডের পুজোতে এবছর উঠে এসেছে একটুকরো গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি। পাট এবং বাঁশের ব্যবহারে তৈরি হয়েছে পুজো মণ্ডপ। পুজো কমিটির অন্যতম সদস্য সর্বাশিস ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাঙালিদের জীবন থেকে বহু কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। তার সংরক্ষণ প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই এমন পুজোমণ্ডপ।’ চিত্তরঞ্জন পার্ক মেলা গ্রাউন্ডের পুজোয় অবশ্য থিমের চাকচিক্য থাকে না। পুজো কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নারায়ণ দে জানালেন, সাবেকিয়ানার উপর সবথেকে বেশি জোর দিই আমরা। প্রতিমা হয় একচালার।’
সিআর পার্ক ডি ব্লকের পুজোর এবার ৩০তম বছর। কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুজয় ঘোষ বলেন, ‘এবছর আমাদের আকর্ষণ টেরাকোটার মন্দির। প্রবাসী বাঙালিদের বর্তমান প্রজন্মের বড়ো অংশই বাংলার বিখ্যাত টেরাকোটা মন্দির কখনো চোখেই দেখেনি। বাংলার ঐতিহ্য তাদের সামনে কিছুটা ফুটিয়ে তোলাই এবার আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।’ সিআর পার্ক পকেট-ফর্টির পুজোয় একযোগে শামিল হন কে-ওয়ান ব্লকের বাসিন্দারাও। পোশাকি নাম ‘নবপল্লি’। এই পুজোয় এবারের প্রধান আকর্ষণ জামদানি শাড়ি! নবপল্লি পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমন চট্টোপাধ্যায় জানালেন, প্রায় এক হাজার জামদানি শাড়ির ব্যবহার হয়েছে মণ্ডপ সজ্জায়। এমনকি মা এবং তাঁর দুই মেয়েকে জামজানি শাড়ি পরানো হয়েছে এবার। কার্তিক-গণেশের পরনেও থাকবে জামদানি কাপড়ের ধুতি।’
শেষ পাতে মিষ্টিমুখের মতোই দুর্গাপুজোর আনন্দে আড্ডা যোগ করতেই হয়। চিত্তরঞ্জন পার্কে বারবার সেই ভূমিকা নেয় কালীবাড়ি এবং তার সুবিশাল মাঠ। সিআর পার্ক কালীবাড়ির এই মাঠ আদতে যেন কলকাতার ‘ম্যাডক্স স্কোয়ার’। একটু ঠাকুর দেখা এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে অনেকক্ষণ আড্ডাই সিআর পার্ক কালীবাড়ির মূল প্রাণ। কালীবাড়ির পুজো সম্পূর্ণ সাবেকি। তবে এবছরের পুজোয় মাথায় রাখা হচ্ছে নারীশক্তির জয়গানের ভাবনা, দাবি আয়োজকদের।



