অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো বা হাতের পাঁচ, এই প্রবাদগুলি থিমের বাজারে বেশ বেমানান। থিম এমনই এক পরশপাথর, যেখানে ছাই ও ভাঙা কুলো দু’টিই হয়ে ওঠে নান্দনিক। আবার হাতের পাঁচ দিয়েও দর্শনীয় মণ্ডপসজ্জা করে ফেলা যায়। সামাজিক থেকে স্থাপত্য অনুসারী, প্রাচীন সময়ের ঝলক বা আধুনিকতার প্রতিচ্ছবি— হুগলির পুজো মানচিত্রে ডানকুনি, চণ্ডীতলাকে রাখতেই হয়। এবার নানা থিমের পসরা সাজিয়ে বসেছে ঐতিহ্যের জনপদ চণ্ডীতলা ও আধুনিক নগরায়নের জনপদ ডানকুনি। কোথাও উঠে আসছে এক টুকরো দেশ, তো কোথাও পরিবেশ নিয়ে দ্বান্দ্বিক মতবাদ। আবার কোথাও সাবেকিয়ানার প্রতিচ্ছবি আঁকতে থিম হিসাবে হাজির করা হয়েছে জমিদারি সময়ের বাংলাকে।
এক পৌরাণিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গাছকে ধরতে চেয়েছে ডানকুনির মিলন সংঘ। তাদের এবারের থিম, কল্পবৃক্ষ বা কল্পতরু। বাঙালির একটি পৌরাণিক কল্পবৃক্ষ আছে। আবার শীতলপুজো থেকে বালগোপালের পুজো, যেখানে গাছের বা প্রকৃতির প্রতিরূপ ব্যবহার করা হয়। ষষ্ঠীপালন, এমনকি দেবীর পুজোর প্রাক্কালে কলাবউ স্নানের মতো নানা আচারেও সেই ধারা আছে। কিন্তু বাস্তবে সেই মানুষই প্রকৃতিদেবীকে নিয়মিত রুষ্ট করে চলেছে গাছ কাটার মাধ্যমে। সাধ আর সাধনার এই দ্বন্দ্বকেই থিমের অবয়বে ধরা হয়েছে। বিরাট দরদালানের আদলে তৈরি মণ্ডপের অন্দরসজ্জায় থাকছে কল্পবৃক্ষের অবয়ব। মণ্ডপজুড়ে তার শিকড় ও ডালপাড়া ছড়িয়ে পড়েছে। আলোকসজ্জার বিশেষ কায়দায় সেগুলি প্রাণবন্ত হবে। মণ্ডপেই তৈরি হবে বসন্তের আবহ। প্রতিমা এখানে বিমূর্ত এবং আধুনিক গড়নের। পুজোর উদ্যোক্তা গোপাল প্রামাণিক বলেন, আমাদের ১২ বছরের পুজো। মণ্ডপ থেকে প্রতিমা যেমন ভাবাবে, তেমনই চমক জাগাবে।
পুজো মরশুমের আসল কথা চমক। সেই কারণেই পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র দেশ ভ্যাটিকানকে মণ্ডপে এনে ফেলেছেন কালীপুর স্পোর্টিংয়ের কর্তারা। বিরাট আকারে ভ্যাটিকানের একটি অংশকে তুলে ধরা হচ্ছে। মূলত, গ্রিক গথিককেই আশ্রয় করে মণ্ডপসজ্জার সুর সাধা হয়েছে। বাহির ও অন্দরসজ্জায় ভ্যাটিকানের নানা আদল তুলে ধরে মোহনীয় মণ্ডপসজ্জার কাজ ইতিমধ্যেই দ্রুতগতিতে চলছে। থিম সংস্কৃতি এক অদ্ভুত মিলনক্ষেত্র। যেখানে তর্ক নয়, দৃশ্যরস উপভোগ করাই আসল। তাই ভ্যাটিকানের সঙ্গে দেবী দুর্গার সম্পর্ক যে একেবারেই নেই, সে প্রশ্ন তোলার থেকে অসামান্য স্থাপত্যকে তুলে ধরার প্রয়াস উপভোগ করাই ভালো। ভ্যাটিকানের মণ্ডপসজ্জার সঙ্গে দেবীর সাবেক প্রতিরূপ এখানে বিশেষভাবে দর্শনীয়। পুজো উদ্যোক্তা জয় সিংহ বলেন, আলোকসজ্জার রকমারি সাজে মণ্ডপকে সাজিয়ে তোলা হবে।
চণ্ডীতলার নবজাগরণ সংঘ অন্যতম বড়ো পুজো উদ্যোগ। সেখানে সাবেক কালের জমিদার বাড়ির পুজোর খণ্ডচিত্রের নহবত সাজিয়ে বসেছেন উদ্যোক্তারা। বেলোয়াড়ি ঝাড় থেকে সাবেক ঘরানার আলোকসজ্জা, জমিদারি জৌলুসের আধুনিক প্রকাশ চোখ ধাঁধাবেই। পুজোর উদ্যোক্তা হুগলি জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ সুবীর মুখোপাধ্যায় বলেন, দেবী আমাদের রাজরাজেশ্বরী হয়ে দর্শন দেবেন। ফলে, সামাজিক বার্তার বিমূর্ত প্রকাশ, ভ্যাটিকানের অন্দরমহল ঘুরে ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা, এক আধারে নানা আকর্ষণ সাজিয়ে বসেছে চণ্ডীতলা, ডানকুনি।



