স্তম্ভ থেকে শক্তির আরাধনা, বড়িশা ক্লাবের পুজোয় কালরেখা
  • ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা: প্যান্ডেলে পা রাখতেই চোখ পড়ল আকাশ ছোঁয়া এক কালো স্তম্ভে। মেরুদণ্ডের আদলে গড়া স্তম্ভটি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, মানুষ আর মিনার— দু’জনেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার গল্প বলে। একটু এগতেই সামনে অশোক স্তম্ভ, যা আমাদের দেশের পরিচয়। তাকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য বুড়ো আঙুল, প্রতিটির ছাপ আলাদা। আমাদের মতোই আর কী! আছে মৌর্য যুগের সিংহ, বৃষ আর হাতির স্তম্ভশীর্ষ, স্তম্ভের ছবি খোদাই করা গুপ্ত যুগের মুদ্রা। সময়ের স্রোতে কত সভ্যতা মুছে গেছে, কত আক্রমণ, কত ক্ষয়, তবু কিছু স্তম্ভ আজও সোজা দাঁড়িয়ে। কালের বুকে এই অমোঘ ঊর্ধ্বমুখী রেখাই কালরেখা। যা এবার বড়িশা ক্লাবের এবারের পুজোর থিম। কালরেখা, দ্য স্টোরি অব ভার্টিক্যালস! পরিকল্পনা ও রূপায়ণে দীপ দাস ও ঈশিকা চন্দ্র, প্রতিমা সৈকত বসুর।

Advertisement

প্যান্ডেলে ইতিহাসের পাতাকে যেন জীবন্ত করে তুলেছেন শিল্পী। গল্পের শুরু মৌর্য যুগে। স্তম্ভের মাথায় তখন সিংহ, বৃষ ও হাতি বসিয়ে রাজশক্তির কথা বলা হতো। গুপ্ত যুগে মুদ্রার ছাপে স্তম্ভ উঠে আসা। তারপর স্তম্ভ হয়ে উঠল দেবতার সঙ্গী। জগন্নাথ মন্দিরে ঢোকার অনুমতি ছিল না চৈতন্য মহাপ্রভুর। তিনি গরুড় স্তম্ভ জড়িয়ে ধরেই দূর থেকে দেবতাকে দর্শন করতেন। সেই ছবিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বড়িশা ক্লাবে। রয়েছে পুরানে স্তম্ভ ফিরে আসার কাহিনীও। নরসিংহের স্তম্ভ চিরে বেরিয়ে আসা। শিব দাঁড়িয়ে রয়েছেন অনন্ত আলোক স্তম্ভ যুগে। এসব দেখে টাইম মেশিনে আপনি পৌরাণিক যুগে ফিরে যেতে বাধ্য। যাত্রা শেষে স্তম্ভ হয়ে ওঠে শক্তি। ওড়িশার খাম্বেশ্বরীতে স্তম্ভই মা দুর্গা। উত্তরকাশীতে ত্রিশূলই শক্তিস্তম্ভ। বড়িশা ক্লাবে সেই ত্রিশূলের সামনেই মায়ের প্রতিমা, প্রাচীন মন্দির-ভাস্কর্যের আদলে গড়া। স্নিগ্ধ মুখ, সূক্ষ্ম অলংকরণে দেবী যেন স্তম্ভের মতোই কালজয়ী।
বড়িশাতে পুজো মানেই বিবিধ ভাবনার সমাহার। তাই কালরেখা দেখার পর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসুন বড়িশা সার্বজনীনে। সেখানে এবারের থিম ‘৮০তে আসিও না ৮-এর তরে’। খড়, মাটি, তালপাতার সেপাই দিয়ে তৈরি প্যান্ডেল দেখলে আপনি নস্ট্যালজিক হয়ে পড়বেন। আশি বছরের বৃদ্ধও ছোটবেলায় ফিরতে বাধ্য। শিল্পী বাপাই সেনের কথায়, ‘বর্তমানে শিশুরা মোবাইলে আসক্ত। তারা জানেই না, তালপাতার সেপাই কী? এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে যদি সমাজে সচেতনতা আনা যায়।’ বড়িশা সার্বজনীনের প্রতিমা তৈরি করেছেন তপন মাঝি। 
বড়িশায় পুজো দেখা হয়ে গেলে এবার রিকশা বা অটোতে উঠে বেহালা ক্লাবে আসুন তেলের জন্য। আরে না, তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বেহালা ক্লাবের পুজোর থিমই তেল, দ্য মার্কেট অব ফেইথ। তেল শুধু রান্নাঘরের উপকরণ নয়। এটা মন্দির, বাজার ও ঘরের মধ্যে প্রবাহিত এক অদৃশ্য সেতু। দৈনন্দিন জীবনে তেল ছাড়া অন্ধকার চারদিক। আর তেল মারার ক্ষমতা অনেক সময় তো যোগ্যতাকেও ছাপিয়ে যায়। এই ভাবনাই প্যান্ডেলে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী প্রদীপ দাস।