নীতীশ চক্রবর্তী, কলকাতা; কালের নিয়মে মহানগরের যৌথ পরিবারগুলি ভেঙে আলাদা হয়েছে। এসেছে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। বাড়ির জায়গায় মাথা তুলেছে ফ্ল্যাট। অনেকে ভেবেছিলেন, ইট-কাঠ-পাথরের এই ঘেরাটোপ বোধহয় উৎসবের দিনগুলিতে বাঙালির একসঙ্গে মেতে ওঠার আনন্দ কেড়ে নেবে। অথচ বাস্তবে হয়েছে ঠিক উলটো। কলকাতা ও শহরতলির আবাসনের পুজোগুলি প্রমাণ করেছে, উমার আবাহনে বাঙালি অন্তত আন্তরিকতায় কোনো খামতি রাখে না। কর্পোরেট ব্যস্ততা আর ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে আইটি প্রফেশনাল থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ— সবাই এখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেন। এখানে দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় রীতি পালন নয়, বরং তা হয়ে ওঠে আধুনিক নগর-জীবনে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষগুলির এক মহামিলনক্ষেত্র।
আজকের দিনে কলকাতার দুর্গাপুজো মানেই কোটি টাকার বাজেট, থিমের লড়াই আর মাইলের পর মাইল লাইনে দাঁড়িয়ে ঠাকুর দেখার ঝক্কি। সেখানে এক চিলতে শান্তির খোঁজ দেয় শহর ও শহরতলির আবাসনের পুজোগুলি। এখানে স্পন্সরশিপের দরাদরি নেই, নেই ভিআইপি পাসের অহংকার। পঞ্চমীর সকালে পাশের ফ্ল্যাটের জেঠিমার হাতের নাড়ু থেকে শুরু করে আবাসিকদের নিয়ে জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—এসবই এই পুজোগুলির আসল ইউএসপি। এই একসঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকার আদর্শকেই পাথেয় করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সুকৃষ্টি’। দমদমের নাগেরবাজার সংলগ্ন আর এন গুহ রোডের ছ’টি পৃথক আবাসনকে একছাতার তলায় এনেছে সংগঠনটি। গত দেড় দশক ধরে শারদোৎসবের আনন্দে একসূত্রে বাঁধা পড়েছেন আবাসনের শতাধিক পরিবার। এবার সুকৃষ্টির দুর্গোৎসবের পঞ্চদশ বর্ষ। তাই উৎসবের আয়োজনেও থাকছে বিশেষ মাত্রা। সভাপতি শ্যামল কুমার পাত্রের কথায়, ‘কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে সুকৃষ্টি হয়ে উঠেছে এক বৃহৎ পরিবার।’
দুর্গাপুজো করার ৪৩ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্টোডাঙার বিধান নিবাস আবাসনের। এখানে দেবী সালঙ্কারা। আবাসিকরাই সাধ্যমতো সব গয়না একটু একটু করে তৈরি করিয়েছেন। পুজোর দিনগুলির প্রতি সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। পুজোর পাঁচদিন রান্নাঘর বন্ধই রাখেন আবাসিকরা। কমিটির সভাপতি কাশীনাথ পাল জানালেন, আবাসিকদের জন্য পুজোর ভোগ তো থাকেই। সেই সঙ্গে আবাসনের পুজো কমিটির ক্যান্টিনেও ভোজনরসিকদের জন্য ভরপুর আয়োজন থাকবে।
মাতৃ আরাধনায় পিছিয়ে নেই শহরতলির আবাসনও। সোদপুরের মার্লিন ম্যাক্সিমাস আবাসনের পুজোর এবার সপ্তম বর্ষ। পুজোর সভাপতি ডাঃ মানস সোম বলেন, ‘এবারে আমাদের পুজোর থিম স্ত্রী শক্তি। মা-বোনদের সামাজিক লড়াইকেই তুলে ধরা হচ্ছে। রাজবাড়ির আদলে তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। ষষ্ঠী থেকে নবমী প্রতিদিনই নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন আবাসিকরা।’ বারাসতের ম্যাগনোলিয়া ফ্যান্টাসিয়া অধিবাসীবৃন্দের দুর্গাপুজো বয়সে আরও নবীন। পুজোর বয়স মাত্র তিন বছর হলেও উৎসাহে খামতি নেই আবাসিকদের। আবাসন চত্বরের মুক্তমঞ্চেই তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। পুজো কমিটির আহ্বায়ক শ্যামল সাহা জানান, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে হাজির থাকবেন প্রাক্তন ফুটবলার আলভিটো ডি কুনহা। পঞ্চমী থেকে নবমী প্রতিদিনই চলবে পাত পেড়ে খাওয়াদাওয়া। এছাড়া প্রতিদিনই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান-নাচ-নাটক থাকবে। একটি সন্ধ্যা মহানায়ক উত্তমকুমারকে নিয়ে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনাও রয়েছে।



