


নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: আদালতের নির্দেশকে অমান্য করেই ঠিকাদারদের দিয়ে ‘বনসৃজন’ প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে চলেছেন বনদপ্তরের কর্তারা। আগামী ১৪ জুলাই থেকে রাজ্যজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বনসৃজন শুরু হচ্ছে। এবছর বনমহোত্সবের মূল অনুষ্ঠানটি হবে শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি পার্কে। উত্সব পালিত হবে জেলাগুলিতেও। পুরুলিয়া জেলায় আগামী ১৬ জুলাই বনমহোত্সবের আয়োজন করা হয়েছে। বনসৃজন প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে ইতিমধ্যেই টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুরুলিয়া জেলার প্রতিটি বনবিভাগই। যা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
রাজ্যের মুখ্য বনপাল (দক্ষিণ পশ্চিম চক্র) বিদ্যুৎ সরকার বলেন, ‘টেন্ডার করা যাবে না,এমনটা নয়। টেন্ডার করেও বনসৃজন করা যায়।’ যদিও ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর বনদপ্তরের জারি করা নির্দেশিকা অন্য কথা বলছে। ওই নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, বনসৃজন প্রকল্প বাস্তবায়নের করবেন যৌথ বন পরিচালন কমিটির সদস্যরাই। গাছ লাগানো ও তার সঙ্গে যুক্ত বিবিধ কাজের ক্ষেত্রে কোনও ভাবেই টেন্ডার ডেকে ঠিকাদারদের এই কাজে নিযুক্ত করা যাবে না।যদিও রাজ্যের জারি করা এই নির্দেশিকাকেই বারবার অমান্য করতে থাকে বিভিন্ন বনবিভাগ। পুরুলিয়া জেলাজুড়ে প্রায় প্রতি বছরই ঠিকাদার নিয়োগ করে বনসৃজন হতে থাকে। এতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। যে পরিমাণ গাছ লাগানোর কথা, সেই পরিমাণ গাছ আদৌলাগানো হয় না বলে অভিযোগ ওঠে।নায্য মজুরি থেকেও বঞ্চিত হতে থাকেন শ্রমিকরা। অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকে বনবিভাগগুলির বিরুদ্ধে।
এইসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে জনস্বার্থ মামলা হয় কলকাতা হাইকোর্টে। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে মামলার রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ২০১৯ সালের বনসৃজন সংক্রান্ত রাজ্যের যে নির্দেশিকা রয়েছে, তা মেনেই কাজ করতে হবে। যদিও সেই বছরই আদালতের নির্দেশ অমান্য করে পুরুলিয়ার বিভিন্ন বনবিভাগ। এরবিরুদ্ধে ফের আদালত অবমাননার মামলা হয় হাইকোর্টে। মামলার পরবর্তী শুনানি জুলাই মাসে।এনিয়ে অবশ্য রিভিউ পিটিশন করেছিল বনদপ্তর!যদিও তা খারিজ করে দেয় আদালত।প্রশ্ন উঠছে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে কেন বারবার বেনিয়মের চেষ্টা করছেন বনদপ্তরের আধিকারিকরা? শ্রমিকদের মজুরিতে ভাগ বসিয়ে নিজেদের পকেট ভরানোর জন্যই কি মরিয়া হয়ে উঠেছেন তাঁরা?
যৌথ বন পরিচালন কমিটি তৈরির মূল উদ্দেশ্যই ছিল জঙ্গল রক্ষার পাশাপাশি জঙ্গলের বিস্তার ঘটানো। এর বিনিময়ে কমিটির সদস্যদেরও জঙ্গলের কাঠ বিক্রির লভ্যাংশের একটা পরিমাণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বনসৃজনের মতো প্রকল্পে শ্রমিকদের সরাসরি যুক্ত করা হয়। যদিও বিগত বছরগুলিতে শ্রমিকদের ব্যাপক বঞ্চনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। গাছ লাগানো, গর্ত খোঁড়া, আগাছা পরিষ্কার, সার দেওয়া থেকে শুরু করে পৃথক কাজের জন্য পৃথক মজুরি বরাদ্দ থাকে। যদিও সেইসব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। তাছাড়া শ্রমিকদের মজুরির টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়েছিল নগদে। এনিয়ে বহু অভিযোগই জমা পড়েছিল বনদপ্তরে। সেসবের সুরাহা এখনও হয়নি। এরমধ্যে ফের ঠিকাদারদের দিয়ে বনসৃজনে সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন শ্রমিকরা।
পুরুলিয়ার ডিএফও অঞ্জন গুহ অবশ্য বলেন, ‘টেন্ডার ডেকে ঠিকাদারদের দিয়ে বনসৃজন প্রকল্পের কাজ হলেও যৌথ বনপরিচালন কমিটির সদস্যরাই তা বাস্তবায়ন করবেন। শ্রমিকরা তাঁদের নায্য দৈনিক ৩৩০ টাকা মজুরি থেকে বঞ্চিত যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে।’