নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: দাউদাউ করে জ্বলছে মশাল। গলগল করে বেরচ্ছে কালো ধোঁয়া। ঠিক মাথার ওপরই বসানো রয়েছে স্প্রিঙ্কলার। নিয়ম অনুযায়ী, ধোঁয়ার আঁচ পেয়ে তীব্র বেগে জল ছিটকে বেরিয়ে আসার কথা। কিন্তু কোথায় কী! স্প্রিঙ্কলার থেকে বের হল না এক ফোঁটা জল। দমকল কর্তাদের পরীক্ষায় ডাহা ফেল করল সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা।
ঘড়ির কাঁটায় তখন সোমবার বেলা প্রায় ১২টা। হাসপাতাল চত্বরে তখন জোরকদমে চলছে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার পাঠ। আচমকা আগুন লাগলে ঠিক কী করতে হবে, কীভাবে পাইপ লাইন খুলে দ্রুত জল দিতে হবে, তা নিয়ে হাসপাতালের কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে হাতেকলমে শেখাচ্ছিলেন দমকল কর্মীরা। সচেতনতার সেই পাঠ চুকতেই কর্তারা যখন সদলবলে হাসপাতালের পুরাতন ভবনের অন্দরে ঢুকলেন ব্যবস্থা যাচাই করতে, তখনই প্রকাশ্যে এল এই অব্যবস্থার ছবি।
যে ভবনে এই পরীক্ষা চলছিল, সেখানেই রয়েছে প্রসূতি ও শিশু বিভাগ। এখানে নবজাতকদের জন্য রয়েছে মোট ১০৬টি বেড, যার মধ্যে ৪২টি এসএনসিইউ শয্যা। প্রসূতি মায়েদের জন্য রয়েছে ১৭৬টি শয্যা এবং স্ত্রীরোগ বিভাগে রয়েছে আরও ৩৫টি বেড। মা ও সদ্যোজাতদের ভিড়ে দিনরাত গমগম করা এই চত্বরে আগুন লাগলে রোগীদের বাঁচা যে কতটা কঠিন, সোমবারের মহড়াই চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিল। এই ছবি প্রকাশ্যে আসতেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গত আগস্টেই বীরভূমের তারাপীঠের একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ৯ আবাসিক ঝলসে মারা যান। ঠিক তার পরের দিনই কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলেও একইভাবে মৃত্যু হয় আরও ৯ জনের। সেই জোড়া অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে জেলাজুড়ে হোটেল মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে কড়া ভাষায় সুরক্ষা বিধি মেনে চলার ফতোয়া দিয়েছে প্রশাসন। অথচ নিজেদের নাকের ডগায় থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন বেহাল দশা কেন। হাসপাতালের এক কর্তা বলেন, পুরাতন বিল্ডিংয়ে বিদ্যুৎ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ঠিক রাখার দায়িত্ব পূর্তদপ্তরের। কোথায় কী খামতি রয়েছে, তা দেখার দায়িত্ব তাদেরই। যদিও এনিয়ে পূর্তদপ্তরের কর্তারা মুখে কুলুপ এঁটেছে। সিউড়ি ফায়ার স্টেশনের ওসি অভিষেক দাস পরিস্থিতি সামাল দিতে বলেন, চেকিং চলছে, কোথায় গাফিলতি আছে সেগুলোই যাচাই করা হচ্ছে। হাসপাতালের সুপার ডাঃ প্রকাশচন্দ্র বাগ বলেন, ‘গত সপ্তাহে অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে একটি রাজস্তরের বৈঠক হয়েছিল। রাজ্যের কর্তাদের নির্দেশেই হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার বন্দোবস্ত করা হয় এদিন। গাফিলতি ধরা পড়েছে। এখনও পর্যন্ত পিডব্লিউডি ফায়ার সেফটির বিষয়টি আমাদের হস্তান্তর করেনি। আশা করছি দু’-একদিনের মধ্যেই এটার সমাধান করে ফেলব।’
প্রশ্ন হল, দুর্ঘটনা কি বলে কয়ে আসে? যে কোনো মুহূর্তে এই জতুগৃহে আগুন লাগলে দায় ঠেলাঠেলির খেলায় রোগীদের জীবনের দাম কে দেবে? সব মহলকে নিয়ম শেখানো প্রশাসন নিজেদের গাফিলতি ঢাকবে কী দিয়ে, সেটাই এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন।