হিমাংশু সিংহ: রেজিনগর জয় শুভেন্দু অধিকারীর বিরাট সাফল্য। সঙ্গে নন্দীগ্রামের রেকর্ড মার্জিন। তবে আগের তৃণমূল জমানাতেও ভোটের ফল বেরলেই বিরোধীরা বলত প্রহসন আর শাসক মুচকি হেসে উন্নয়নের জয়গান গাইত। শুক্রবারও তার অন্যথা হল না এতটুকু। নন্দীগ্রামে বিজেপির জয় প্রত্যাশিতই ছিল। আগ্রহ যেটুকু ছিল মার্জিন নিয়ে। কিন্তু চমক দিল রেজিনগর। শুভেন্দুবাবুর দাবি, গত পাঁচ মাসে সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিরোধীদের মিথ্যাচার ধরা পড়ে যেতেই ঢেলে ভোট পেয়েছে পদ্ম পার্টি। বিজেপি এলেই সংখ্যালঘুদের ক্যাম্পে পাঠানোর বিভ্রান্তি কেটেছে। হিন্দু মুসলমান রাজনীতির শেষ দেখে ছেড়েছেন তিনি। দোসর উন্নয়ন। নাহলে নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে ৭০ শতাংশ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কেন্দ্রে ৬৩ শতাংশ রেকর্ড ভোট পায় বিজেপি! এর দুটো কারণ হতে পারে। হয় মানুষের আস্থা বেড়ে গিয়েছে লাফিয়ে। নতুবা ভয় কাজ করেছে সংখ্যালঘুদের মনে। কোনটা সত্যি তার উত্তর একমাত্র জনগণই দিতে পারবেন সঠিক সময়ে।
মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগেই গুজরাতের ভাদনগরে দাঁড়িয়ে আসন্ন লোকসভা ভোটে বঙ্গে ৪২-এর মধ্যে ৪২ আসন জেতার অঙ্গীকার করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ওটাই হবে তাঁর গুরুদক্ষিণা। মোদিজির টানা ২৫ বছর প্রশাসনিক শীর্ষ পদে থাকার উৎসবে তাঁর বার্তার প্রতিপাদ্য ছিল একটাই, ঊনত্রিশে জিতে কেন্দ্রে বিজেপির জয় পতাকাকে তুলে ধরায় চেষ্টার কসুর করবেন না তিনি। মোদিজির চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে বসার লড়াইয়ে অন্যতম অবলম্বন হবে বাংলা থেকে জেতা ৪২টি পদ্ম আসন, যার উপর দাঁড়িয়ে বিজেপি কেন্দ্রে নিরঙ্কুশ হবে। আগেরবারের মতো ২৪০ আসনে আটকে যাবে না। এই আপাতত শুভেন্দুবাবুর শপথ। অমিত শাহের দেওয়া টাস্কও বলতে পারেন। শুক্রবার নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে বিজেপির বিরাট ব্যবধানের জয় নিশ্চিতভাবে সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ার পথে প্রথম ধাপ। একাজে তিনি সফল।
কিন্তু সব সাফল্যই কিছু অস্বস্তি ও অপ্রিয় প্রশ্ন নিয়ে আসে। নন্দীগ্রামে বিজেপির এই রেকর্ড জয়েও প্রধান বিরোধী হিসাবে কংগ্রেসের উঠে আসা চিন্তার। কে না জানে কংগ্রেসের পুরানো ভোটব্যাংক জোড়া লাগলে শাসকেরই বিপদ রাজ্যে রাজ্যে। নন্দীগ্রামে গতবার মাত্র ১ শতাংশ (৭৯৪) ভোট পাওয়া কংগ্রেসের এবারের প্রার্থী মিলন প্রধান পেয়েছেন ৪১ হাজারের চেয়েও কিছু বেশি ভোট। এর রসায়ন একটাই, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে সবাই এককাট্টা হয়। তৃণমূল অণু পরমাণুতে ভেঙে দিশাহীন। বামেরা বলছে অনেক, কিন্তু ভোট ফিরছে না কিছুতেই। অতঃপর আরশোলাদের দৌরাত্ম্যের পাশাপাশি আবার কংগ্রেসের ছাতার তলায় বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হলে মোদি-অমিত শাহ কি খুব একটা খুশি হবেন?
মাত্র পাঁচ মাসে যেভাবে শাসক বিজেপির প্রশ্রয়ে বিরোধীদের শিবির বদল হয়েছে, দল ভেঙে খানখান হয়েছে তাতে বেশ বোঝা যাচ্ছে, মানুষ এখনও মূল বিরোধী কে তা চিনতে পারছে না। সেটাই স্বাভাবিক। টানা ১৫ বছরের শাসক দল একবার নির্বাচনে হারতেই পারে। কিন্তু ৮০ আসন জেতা দলটা যেভাবে রাতারাতি টুকরো টুকরো হয়ে উবে গিয়েছে তা বিরাট রহস্য। তারা আজ যেভাবে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত তা গভীর উদ্বেগের। সংসদীয় ও পরিষদীয় দলের সিংহভাগ সদস্য বিজেপির হাতে তামাক খাচ্ছে। কিন্তু কিছু বিরোধীকে পুষলেই প্রতিবাদ খতম হয়ে যায় না। কী মজা, রাজ্যসভাতেও বিজেপির টিকিট পাচ্ছে তৃণমূল-ত্যাগীরাই। মানুষ প্রশ্ন করবেই, তাহলে পরিবর্তনটা কোথায় হল? ক্রমাগত সেই টানাপোড়েনেই দুই কেন্দ্রেই জামানত হারিয়ে তৃণমূলের দুই যুযুধান গোষ্ঠী অস্তিত্বহীন। এই শূন্যতা থেকেই আবার কংগ্রেসের উত্থান অনিবার্য। কারণ। শুধু শাসক দিয়ে গণতন্ত্র বাঁচে না, শূন্যস্থানে বিরোধীও চাই। শাসকের সাজানো নয়, চোখে চোখ রাখা বিরোধী। দেখছেন না দিল্লিতে কী হচ্ছে! সব জিতেও মোদিজি কেমন হিমশিম খাচ্ছেন?
শুভেন্দুবাবু পাঁচ মাস আগে নন্দীগ্রামে জিতেছিলেন মাত্র ৯৬৬৫ ভোটে। সেবার প্রশাসন পুলিশ তাঁর হাতে ছিল না। অস্ত্র ছিল জ্ঞানেশ কুমারের এসআইআর আর বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনী। সঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে একটা তীব্র জনমত। এবার ক্ষমতা পেয়ে নির্বাচনি প্রচারে তাঁর ছেড়ে আসা আসনে নজিরবিহীন ব্যবধানে জয়ের আহ্বান জানিয়েছিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছিলেন, ব্যবধান এমন হবে সবাই মনে রাখবে। হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক ব্যবধান না রেখে বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সেই আবেদনকে মর্যাদা দিয়ে সেই নন্দীগ্রামেই হাসিরানি রথ জিতলেন ১ লক্ষ ২২ হাজার ভোটে। এই ক’দিনেই মুখ্যমন্ত্রীর তুলনায় পুত্রহারা মায়ের ব্যবধান বেড়ে গিয়েছে প্রায় ১৩ গুণ! যা হার মানিয়েছে ফলতার মার্জিনকেও। এই আসনেই পাঁচ বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরেছিলেন ১৯৫৬ ভোটে। এবার নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর দুই কেন্দ্রেই মমতা ও গণতান্ত্রিক তৃণমূলের জামানত জব্দ। নন্দীগ্রামে দ্বিতীয় স্থানে আর রেজিনগরে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে কংগ্রেস।
রেজিনগরে গত মে মাসে বিজেপি পেয়েছিল ৬৪ হাজার ৬৬০টি ভোট। এবার পেয়েছে ১ লক্ষ ২৯ হাজার ভোট। অর্থাৎ প্রাপ্ত ভোট দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে মাত্র পাঁচমাসে। ৭০ শতাংশ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কেন্দ্রে ৬৩ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে প্রায় ৭৫ হাজার ব্যবধানে জয় নিঃসন্দেহে শুভেন্দু ও শমীকবাবুদের বড়ো সাফল্য। তবে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বাংলায় রেকর্ড ১৮টি আসন জিতেছিল। তারপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে তৎকালীন বিরোধী দল হিসাবে বিজেপি ১২টি আসনে জয় পেয়েছিল, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯টি এবং কংগ্রেস ১টি আসন লাভ করে। হ্রাস পাওয়া আসন সংখ্যা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৪২টি আসনেই জয়ের লক্ষ্যে ১০০ শতাংশ টার্গেট সামনে রেখে অগ্নিপরীক্ষায় ঝাঁপিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সত্যিটা জানা যাবে লোকসভার ফল বেরনোর পর।
যুগে যুগে ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতায় মত্ত শাসক বিরোধীর অস্তিত্ব থাক চায় না। একসময় সিপিএম চায়নি। তৃণমূল রেয়াত করেনি। শমীকবাবুরাও বিরোধীদের অযথা মাথাচাড়া দিতে দেবেন না। এটাই বাস্তব। রাজনীতির ডান বাম বুঝি না। স্বার্থের সংঘাতও না পসন্দ। শুধু জানি, কথা ছিল শাসকের আইনের অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার। বিচার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার। কিন্তু বিগত পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতা বলছে, আইজীবীরাই যেখানে একের পর এক ঘটনায় আক্রান্ত সেখানে বিচার ব্যবস্থা নির্ভয়ে চলবে কোন রসায়নে? বারুইপুর আদালত, ব্যাঙ্কশাল কোর্ট, চন্দননগর এবং শালবনির পর আরও একটি হামলার ঘটনা ঘটল। এবার খোদ কলকাতার বুকে। প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের বাসভবন আক্রান্ত। আইনজীবীদের উপর ক্রমাগত এই ধরনের হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। এ জিনিস সুস্থ গণতন্ত্রের পরিপন্থী। রাজনৈতিক আকচাআকচি, স্বার্থের সংঘাত, দুষ্কৃতী দলের মধ্যে গোষ্ঠী লড়াই সবই চলে জানা এবং চেনা ছকে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে হঠাৎই আইনজীবীদের উপর হামলার বিপজ্জনক ঝোঁক দেখে উদ্বিগ্ন হচ্ছি। নিরাপত্তার অভাব নিয়ে আইনজীবীরাই যদি আদালত ও হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? এই কাজ বর্বরোচিত অপরাধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী। বিকাশবাবুর বাড়িতে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে আইনজীবী মহলেও। আইনজীবী ফিরদৌস শামিম জানিয়েছেন, বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের নজরে আনা হয়েছে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, সরকারের উচিত অবিলম্বে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। চোখ বুজে থাকলে এ ধরনের ঘটনা শুধু বাড়বেই না, দ্রুত ছড়াবে। অচিরেই সব দখলের নেশা মাথায় চড়ে বসবে। এই দখলের নেশা ক্ষমতার সর্বগ্রাসী চেহারারই নগ্ন প্রকাশ।
বিকাশবাবুর অপরাধটা কী? তিনি আদালতে মামলা লড়েন। আগের মমতা জমানা, যাঁকে বিজেপি জঙ্গলের রাজত্ব বলত সেই আমলেও বহু ঐতিহাসিক মামলার তিনি সাক্ষী। চাকরিহারা শিক্ষকদের দাবিই বলুন কিংবা রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ আন্দোলন, আর জি করের নির্যাতিতার সুবিচারের দাবি, আদালতের দরজায় প্রথম কড়া নেড়েছেন যে মানুষটি তাঁর নাম বিকাশ ভট্টাচার্য। তিনি নীরবে আদালতের অলিন্দে কাজ করে গিয়েছেন। নির্দিষ্ট একটা মতাদর্শ তাঁর থাকতেই পারে। তা বলে তিনি টার্গেট হয়ে যাবেন, এ জিনিস মানা যায় না। বিকাশবাবুর আগে আক্রান্ত হয়েছেন আরও দু’জন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং গড়বেতা আদালতে শামিম আহমেদ। যে ডিম দুর্নীতিপরায়ণ তোলাবাজ নেতাদের দিকে ধেয়ে যাওয়ার কথা, তা ছুটে যাচ্ছে নিরপরাধ আইনজীবীদের দিকে। সায়নের দোষ তিনি শাসকের নির্দেশে গ্রেপ্তার হওয়া বন্দিদের ছাড়াতে লড়াই করছেন এবং আইনের বাধা পেরিয়ে জামিন আদায় করে তবেই ছেড়েছেন। তা বলে আইনজীবীদের উপর নির্যাতন কোনো সভ্যসমাজ মানতে পারে? ভরসার বাংলায় আইনজীবীরাই যদি ভয় পেয়ে যান তাহলে সুস্থ আইনি প্রক্রিয়ার মৃত্যু, যা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এর অর্থ মানুষ ভয় পেয়ে আদালতে আসা বন্ধ করে দিক, সর্বত্র শাসকের আইন প্রতিষ্ঠা হোক। অথচ গত নির্বাচনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিই ছিল শমীকবাবুদের মুখে মুখে।
বিরোধীশূন্য ভয়ের রাজ্য সব যুগেই শাসকের জন্য সর্বনাশা। ইন্দিরা গান্ধী এক সময় ক্ষমতার দম্ভে এই সারসত্যটা বোঝেননি। বোঝেননি মমতাও। বর্তমান শাসক ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূলের জঙ্গলরাজের অবসান ঘটিয়ে ভরসার রাজত্ব প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে। ৪২ এ ৪২ হোক, কিংবা ২৯৪ এ ২৯৪। শেষ পর্যন্ত মানুষ কিন্তু হাতে কাজ আর পাতে ভাত চায়। সঙ্গে সবরকম মত প্রকাশের অধিকার ও নিরপেক্ষ আইনের শাসন। ওইটুকু যেন নিশ্চিত হয়, শুভেন্দুবাবুর কাছে এটাই আবেদন। একচেটিয়া ক্ষমতাই ভয় আর দুর্নীতির আঁতুড় ঘর! যুগে যুগে আশঙ্কাটা সেখানেই!



