পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: বিগত সরকারের আমলে পাথর শিল্পাঞ্চল তোলাবাজির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। এমন অভিযোগ তুলে নতুন সংগঠনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিশ্রুতি ছিল পাথর শিল্পকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করার। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর সংগঠনের নাম জড়িয়ে গেল তোলাবাজির ঘটনায়, যা ঘিরে মহম্মদবাজারের পাথর শিল্পাঞ্চলে তুমুল শোরগোল শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি মহম্মদবাজারের পাচামি ও তালবাঁধ এলাকার খাদান ও ক্র্যাশার মালিকদের দু’টি পৃথক সংগঠন ভেঙে একটি সংগঠন তৈরি হয়। নতুন সংগঠন পাচামি মাইন অ্যান্ড ক্র্যাশার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব নেন ব্লকের বিজেপি কনভেনর শুভ্রাংশু চৌধুরী। তিনি বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি ধ্রুব সাহা এবং বর্তমান জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে জেলায় পরিচিত। অভিযোগ, দায়িত্ব নেওয়ার পরই গত ২৫সেপ্টেম্বর সংগঠনের প্যাডে নতুন নির্দেশিকা জারি করেন তিনি। সেখানে পাথর লোডিং চার্জের নামে গাড়ি পিছু ১০০টাকার রেট একলাফে বাড়িয়ে ২০০টাকা করা হয়। সংগঠনের তরফে হলুদ স্লিপ ছাপিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডাম্পারপিছু দেদার তোলাবাজি চলছিল বলে অভিযোগ। প্রতিদিন প্রায় চার হাজার লরি চলে। অর্থাৎ, দৈনিক প্রায় আট লক্ষ টাকা তোলা হচ্ছিল বলে প্রশাসনের অনুমান। বুধবার প্রশাসনের আচমকা অভিযানে বিজেপি নেতার সংগঠনের তোলাবাজির পর্দাফাঁস হয়।
স্থানীয় সূত্রের খবর, সম্প্রতি সংগঠনের এই তোলাবাজির খবর পৌঁছায় খোদ নবান্নে। সেখান থেকেই আসে কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ। তারপরই গত ৬অক্টোবর মহম্মদবাজারের বিএলএলআরও দপ্তরের কর্তা ও পুলিশ যৌথভাবে সোঁতশাল ও ভাঁড়কাটা চেকগেটে আচমকা অভিযান চালায়। সেই অভিযানের রিপোর্ট জমা পড়েছে অতিরিক্ত জেলাশাসকের(ভূমি ও ভূমি সংস্কার) দপ্তরে। রিপোর্টে বলা হচ্ছে, অভিযানে নেমে পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা সোঁতশাল চেকগেটে অশোক যাদব নামে এক ডাম্পার চালকের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ওই হলুদ স্লিপ দেখিয়ে দাবি করেন, রাস্তায় রসিদ ধরিয়ে জোর করে ২০০টাকা আদায় করা হচ্ছে। এরপর ভাঁড়কাটা চেকগেটে মহম্মদ ফিরোজ মোল্লা নামে এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে ধরেন আধিকারিকরা। আধিকারিকদের কাছে তিনি স্বীকার করেন, সংগঠনের নির্দেশেই ডাম্পার পিছু ২০০টাকা করে তুলছিলেন। প্রমাণস্বরূপ নিজের পকেট থেকে ২০০টাকা মূল্যের হলুদ রঙের ছাপা রসিদ বই এবং খোদ সভাপতির সই করা সেই নির্দেশিকা বের করে দেখান।
ভূমিদপ্তরের এক শীর্ষকর্তাও মানছেন, লোডিংয়ের নামে গাড়ি মালিকদের কাছ থেকে তোলাবাজি চলছিল। অভিযোগ পেয়েই পদক্ষেপ করা হয়েছে। এবিষয়ে সংগঠনের সভাপতি শুভ্রাংশু চৌধুরী বলেন, ‘২০০টাকা করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তো ক্র্যাশার মালিকরাই নিয়েছেন।’ আপনি খোদ সংগঠনের সভাপতি, আপনিই তো সংগঠনের প্যাডে এনিয়ে নির্দেশিকা জারি করেছেন? তা শুনে ‘এখন গাড়িতে আছি, পরে কথা বলছি’ বলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান ওই বিজেপি নেতা। বিজেপির জেলা সভাপতি উদয়শঙ্করবাবু বলেন, আমরা এই ধরনের তোলাবাজির বিরুদ্ধে। প্রশাসন একদম সঠিক কাজ করেছে।
এব্যাপারে অতিরিক্ত জেলাশাসকের কাছে রিপোর্ট জমা পড়লেও এখনও পর্যন্ত এফআইআর দায়ের করেনি প্রশাসন। বিজেপির মহম্মদবাজার ব্লকের কনভেনর তথা জেলা কমিটির সদস্য ফণীরঞ্জন রায় বলেন, এই ধরনের কাজ দল বা সরকার কেউই সমর্থন করে না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুর্নীতি ও তোলাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন। কেউ অন্যায় করলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিক।’