শ্রীকান্ত পড়্যা, নন্দীগ্রাম: উপ নির্বাচনের ভোট ময়দান কব্জা করতে সোমবারই দলবেঁধে নন্দীগ্রামে পৌঁছে গিয়েছিল বহিরাগতরা। এমনই অভিযোগ তুলেছিল বিরোধীরা। মঙ্গলবার সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হতেই অভিযোগের বাস্তবতা নিয়ে সরব হল বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। প্রতিটি বিরোধী দলের প্রার্থীদের এজেন্টকে মারধর, ভোটারদের স্লিপ কেড়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া, এজেন্টদের বসতে বাধা। আর দুপুর গড়াতেই প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে সরাসরি ইভিএমের দখল নিল অপরিচিত মুখেরা। তাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হলেন কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান। একযোগে বিরোধীদের অভিযোগ, বহিরাগতদের নামিয়ে, পুলিশ-প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে নন্দীগ্রামে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে শাসকদল বিজেপি।
এদিন সকালে কালীচরণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বারুণি বুথে গিয়েছিলেন কংগ্রেস প্রার্থী মিলন। তাঁর সামনেই বহিরাগতরা বুথ কব্জা করে ভোট লুট করে বলে তাঁর অভিযোগ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মহিলা ভোটাররাও একই অভিযোগ তুলে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। প্রবল উত্তেজনা তৈরি হয়। ঘটনাস্থলে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরীর সঙ্গে চরম বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন মিলন। পুলিশকর্তার দাবি, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। তিনি কংগ্রেস প্রার্থীকে দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন। তা নিয়েই ঝামেলার সূত্রপাত। এদিকে, নন্দীগ্রামে ৭০ শতাংশের বেশি বুথে বিরোধীদের এজেন্ট ছিল না। অধিকাংশ বুথে তাঁদের বসতেই দেওয়া হয়নি।
সামসাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের সরবেড়িয়া বুথে পোলিং এজেন্ট হিসেবে বসতে গিয়ে বেধড়ক মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন শেখ সাদ্দাম হোসেন। তিনি সিপিআইয়ের লোকাল কমিটির সম্পাদক। গোলমাল পাকানোর অভিযোগে পুলিশ আটক করে নন্দীগ্রাম-১ ব্লক কংগ্রেস সভাপতি শেখ আসরাফুল্লাকে। রাজারামপুর শুভানিচকে ভোটাররা জোটবেঁধে ভোট দিতে গেলে হাতে কালি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অন্যরা তাঁদের হয়ে ভোট দিয়ে দেন বলে অভিযোগ। খবর পেয়েই সেখানে হাজির হন কংগ্রেস প্রার্থী। একটা সময় চারিদিক থেকে ভোট লুটের অভিযোগ পেয়ে দৃশ্যতই ভেঙে পড়েন মিলন। দৌড়ঝাঁপ, পুলিশে নালিশ ঠুকেই বহিরাগতদের মোকাবিলা করতে পারেননি।বেলা তখন ১১টা। ভেকুটিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ২৮ নম্বর ভীমকাঁটা ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সামনে জটলা। ভোট দিতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ৬৮ বছরের বৃদ্ধ শেখ মহসিন। তিনি বলেন, ‘ভোটার স্লিপ ও এপিক নিয়ে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে এসেছিলাম। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়ানোর পর ভেতরে ঢুকতে ভোটকর্মী আঙুলে কালি লাগিয়ে দেন। তারপর দেখি দু’জন বিজেপি কর্মী আমার ভোট দিয়ে বলল, আপনার ভোট হয়ে গিয়েছে। বাড়ি চলে যান।’ ওই বুথের বাম নেতা নবীর খান বলেন, ‘সিপিআই প্রার্থী শান্তিগোপাল গিরির পোলিং এজেন্ট হওয়ার কথা ছিল আমার। সকাল সাড়ে ৬টায় বুথে যাওয়ার পথে বিজেপির ২৫-৩০ জন ছেলে বাধা দেয়। আমি ফিরে আসি।’ দিনের শেষে এইসব বিক্ষিপ্ত অভিযোগ একসূত্রে গাঁথেন কংগ্রেস, বাম ও আইএসএফ প্রার্থীরা। তবে, ঋতপন্থী তৃণমূল প্রার্থী এতেসামুল হক বলেন, ‘উপ নির্বাচন এত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ খুব কম হয়। ৯ তারিখ আমিই জিতব।’ কংগ্রেস প্রার্থী মিলন বলেন, ‘বহিরাগতদের এনে লাগামছাড়া ভোট লুট করিয়েছে বিজেপি। বহু বুথে ভয়ভীতি দেখিয়ে আমার এজেন্টদের তুলে দেওয়া হয়েছে।’ সিপিআই প্রার্থী শান্তিগোপাল বলেন, ‘আমাদের এজেন্টদের মারধর করে বের করে দিয়েছে। আগেরদিন রাত থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ হুমকি দিয়েছে। বিজেপি ভয় পেয়ে এসব করছে।’ বিরোধীদের সব অভিযোগ নস্যাৎ করে বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক মেঘনাদ পাল বলেন, ‘অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে।’ ভোট দেওয়ার লাইন।-নিজস্ব চিত্র