Bartaman Logo
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

৭২ বছরেও অক্লান্ত মৃৎশিল্পী গীতা পাল, তাঁর তৈরি প্রতিমার কদর সর্বত্র

মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আজকের নয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে হাতে মাটি তুলে নিয়েছিলেন। সেই শুরু। দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে প্রায় ছয় দশক। বয়স এখন ৭২।

৭২ বছরেও অক্লান্ত মৃৎশিল্পী গীতা পাল, তাঁর তৈরি প্রতিমার কদর সর্বত্র
  • ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর:  মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আজকের নয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে হাতে মাটি তুলে নিয়েছিলেন। সেই শুরু। দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে প্রায় ছয় দশক। বয়স এখন ৭২। তবুও মাটি, খড়, বাঁশ আর রং-তুলিই তাঁর নিত্যসঙ্গী। কৃষ্ণনগরের পালপাড়ার প্রবীণ মৃৎশিল্পী গীতা পাল আজও গড়ে চলেছেন দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী সহ নানা দেবদেবীর প্রতিমা। বয়স বাড়লেও কাজের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কমেনি। 

Advertisement

ছোটবেলা থেকেই বাবাকে মাটির কাজ করতে দেখতেন। মাটির তাল থেকে কীভাবে ধীরে ধীরে প্রতিমা রূপ পাচ্ছে, তা দেখতে দেখতে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবার কাছেই কাজ শেখা শুরু। প্রথমে ছোটোখাটো কাজে বাবাকে সাহায্য করতেন। পরে নিজেই প্রতিমার মুখ, চোখ, নাক তৈরি করতে শেখেন। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা বাড়ে। একসময় মৃৎশিল্পই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান কাজ।
দীর্ঘদিন ধরে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন তিনি। বছরের পর বছর ধরে তৈরি করেছেন অসংখ্য প্রতিমা। তাঁর হাতে তৈরি প্রতিমা নদীয়া জেলার পাশাপাশি রাজ্যের অন্যান্য জায়গাতেও পৌঁছেছে। তাঁর কাজের সূক্ষ্মতা ও প্রতিমার গড়ন পছন্দ করেছেন বহু পুজো উদ্যোক্তা। কৃষ্ণনগরের বেশ কয়েকটি বারোয়ারি পুজো কমিটি দীর্ঘদিন ধরে তাঁর থেকেই প্রতিমা তৈরি করিয়ে আসছে।
নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে গীতা পাল জানান, ছোটবেলায় পড়াশোনার প্রতি খুব একটা আগ্রহ ছিল না। বাবাকে দেখে মাটির কাজ শেখার ইচ্ছা হয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না। তাই ছোট বয়স থেকেই বাবার কাজে সাহায্য করার শুরু। তখন ভাবেননি, এই কাজই একদিন তাঁর জীবনের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠবে।
গীতা দেবী আরও  বলেন, ‘মাটির কাজ করতে করতে এই কাজের সঙ্গে কখন যে ভালোবাসা তৈরি হয়ে গিয়েছে, তা বুঝতেই পারিনি। মা দুর্গা, মা কালী কিংবা মা জগদ্ধাত্রীর প্রতিমা নিজের হাতে তৈরি করার আনন্দ আলাদা। বিশেষ করে প্রতিমার চোখ আঁকার সময় মনে হয়, যেন মাটির মূর্তিতে প্রাণ আসছে।
বয়স এখন ৭২। তাই আগের মতো বেশি কাজ নেওয়া সম্ভব হয় না। তবুও পুজোর মরশুমে কাজের চাপ রয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার আসছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পরিচিত কয়েকটি বারোয়ারি পুজোর প্রতিমাও তৈরি করতে হচ্ছে তাঁকে। যতদিন শরীর সঙ্গ দেবে, ততদিন মাটির কাজ করে যেতে চান এই প্রবীণ শিল্পী। তাঁর মতে, মৃৎশিল্পীদের আরও সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আরও এগিয়ে যেতে পারে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের আরও বেশি করে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা শুভাশিস হালদার বলেন, গীতা পালের তৈরি প্রতিমা সত্যিই খুব সুন্দর। ছোটবেলা থেকেই ওঁর কাজ দেখে আসছি। কৃষ্ণনগরের বহু বারোয়ারি পুজো কমিটি বছরের পর বছর ওঁর কাছ থেকেই প্রতিমা তৈরি করায়। প্রতিটি প্রতিমায় ওঁর পরিশ্রম ও শিল্পের ছাপ থাকে। উনি আমাদের কৃষ্ণনগরের গর্ব। সময়ের সঙ্গে প্রতিমা তৈরির পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এসেছে নতুন প্রযুক্তিও। কিন্তু গীতা পালের মাটির প্রতি ভালোবাসায় পরিবর্তন আসেনি। তাঁর দীর্ঘ শিল্পজীবন আজও প্রমাণ করে, ভালোবাসা ও নিষ্ঠা থাকলে বয়স বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ