ক্যানিংয়ে ‘ডাইনি’ সন্দেহে বৃদ্ধা খুন: ২৪ বছর আগের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত ৩ জন
  • ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি কলকাতা: ২০০২ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং থানা এলাকার ঘটনা। ‘ডাইনি’ অপবাদ দিয়ে এক বৃদ্ধাকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে খুন করে নির্জন জায়গার পুকুরে দেহ পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনার তিন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করল আলিপুর আদালত। সোমবার আলিপুরের ফাস্ট ট্রাক কোর্টের (অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা) বিচারক মণিকুন্তলা রায় বর্তমানে জামিনে থাকা তিন অভিযুক্তকে খুন ও প্রমাণ লোপাটের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন। আগামী ১৪ অক্টোবর দোষীদের সাজা ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন বিচারক। এই মামলার বিচার চলাকালীন এক অভিযুক্ত মারা যায়। বাকি তিনজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। তাদের নাম লোদো সর্দার, তারাপদ সর্দার ও সুবোধ সর্দার।

Advertisement

মামলার বিশেষ সরকারি আইনজীবী ইন্দ্রজিৎ রায় জানান, ঘটনার রাতে বৃদ্ধা কীর্তন শুনে গ্রামের পথ ধরে বাড়ি ফিরছিলেন। আচমকা তাঁকে ঘিরে ধরে লাঠিসোটা ও ধরালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। বৃদ্ধা মারা যান। এরপর প্রমাণ লোপাটের জন্য মৃতদেহ গ্রামের একটি পরিত্যক্ত পুকুরে পুঁতে দেওয়া হয়। রাতে মা বাড়ি না ফেরায় বৃদ্ধার ছেলে  ক্যানিং থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন। পুলিশ তদন্ত নেমে ওই পুকুর থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে। ময়না তদন্তে বৃদ্ধার শরীরে একাধিক আঘাতের  চিহ্ন পাওয়া যায়। খুন ও প্রমাণ লোপাটের মামলা দায়ের হয়। কিন্তু তদন্তের ক্ষেত্রে গড়িমসির অভিযোগ ওঠে ক্যানিং থানার পুলিশের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, পরবর্তী সময়ে পুলিশ আদালতে রিপোর্ট পেশ করে জানায়, অভিযোগ ভিত্তিহীন। পুলিশের এই রিপোর্ট চ্যালেঞ্জ করে নিহত বৃদ্ধার ছেলে আলিপুর আদালতে পুনরায় তদন্তের আবেদন করেন। আদালতে তাঁর অভিযোগ ছিল, পুলিশ তদন্তকে প্রহসনে পরিণত করেছে। অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তাই নতুন করে মামলার তদন্ত প্রয়োজন। দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারক মামলার তদন্তভার দেয় সিআইডিকে। সেই সঙ্গে তদন্ত দ্রুত শেষ করতে বলে আদালত। তদন্তে নেমে সিআইডি জানতে পারে, এই খুনের পিছনে রয়েছে জমিজমা সংক্রান্ত বিবাদ। সেই বিবাদের মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতেই বৃদ্ধার নামে ‘ডাইনি’ অপবাদ ছড়িয়ে দেওয়া হয় গ্রামে। তাতেও খুব একটা কাজ না হওয়ায় বৃদ্ধাকে খুনের পরিকল্পনা করে অপরাধীরা। গোয়েন্দারা সমস্ত তথ্য হাতে পাওয়ার পর ওই গ্রাম থেকে চার অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। তাদের লাগাতার জেরা করে পুলিশ রক্তমাখা লাঠি এবং লোহার রড উদ্ধার করে পরীক্ষাগারে পাঠায়। মামলাটি  বিচারের জন্য যায় আলিপুরের নিম্ন আদালত থেকে জেলা আদালতে। সেখানে হত্যার চার্জ গঠন করা হয়। যদিও আদালতে অভিযুক্তরা নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করে। মূল মামলার বিচারে সাক্ষ্য দেন ২৪ জন। দীর্ঘ শুনানি শেষে এদিন বিচারক তিন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেন। সরকারি আইনজীবী আদালতে বলেন, ‘এই ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। আদালত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া সাজা ঘোষণা করুক।’ যদিও তিন অপরাধী এদিনও আদালতে দাবি করে যে তারা ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নয়। কড়া নিরাপত্তায় তাদের আলিপুর কোর্ট লকআপে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বৃদ্ধার পরিবারের সদস্যরা।