মণিরাজ ঘোষ, খড়্গপুর: শালবনীর সরকারি খামার থেকে অবৈধভাবে ডিম পাচারের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগের তির খামারের এক শীর্ষ আধিকারিকের দিকে। ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ওই আধিকারিকই ডিম পাচারের ‘সিন্ডিকেট’ চালাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যা নামলেই একাধিক ছোট ও বড় গাড়িতে করে হিসাব বহির্ভূত ডিম বাইরে পাচার করা হতো। অভিযোগ যে একেবারে অসত্য নয়, তা মানছেন ফার্মের একাধিক কর্মী থেকে জেলা প্রশাসনের একাংশও। ফার্মের ভিতর ‘চোর’ যে রয়েছে, সেটাও কার্যত মেনে নিয়েছেন প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী রাজেশ মাহাত। তিনি বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে ‘বর্তমান’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা চোর ধরা শুরু করেছি। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই সরকারি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। আমরা কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছি। কাউকেই রেয়াত করা হবে না।’
সোমবার রাতে খড়্গপুর গ্রামীণের চৌরঙ্গী এলাকায় পুলিশ একটি ডিম বোঝাই ট্রাক আটক করতেই সরকারি খামারের ‘ডিম কেলেঙ্কারি’ ফাঁস হয়ে পড়ে। প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নিগমের কর্তারাই ছিলেন পুলিশের ‘গোপন সূত্র’। ভাঙ্গড়গামী ওই ট্রাকে প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি ছিল। পুলিশ সূত্রে খবর, সরকারের খাতায়-কলমে যে পরিমাণ ডিম খামার থেকে বেরোনোর কথা ছিল, তার থেকে অনেক বেশি ডিম ট্রাকে বোঝাই করা হয়েছেল। ওই অতিরিক্ত ডিম সম্পূর্ণ অসাধু উপায়ে পাচার করা হচ্ছিল। পুলিশ তদন্তে নেমে মূল মাথাদের খোঁজ শুরু করেছে।
প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নিগমের অধীন শালবনীর ওই ফার্ম ২০২৪ সালে পথচলা শুরু করে। এটি রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুরগি খামার। প্রতিদিন প্রায় ৩ লক্ষ ডিম উৎপাদন হওয়ার কথা এই ফার্ম থেকে। প্রশাসনের একটি বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, বর্তমানে এই ফার্ম থেকে সরকারি হিসেবে প্রতিদিন দেড় থেকে দু’লক্ষ ডিম বাইরে পাঠানো হয়। কিন্তু, সরকারি এই হিসেবের বাইরেও প্রচুর ডিম নিত্যদিন গায়েব হয়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। এর নেপথ্যে রয়েছেন ফার্মেরই এক উচ্চপদস্থ কর্তা। তাঁর মদতেই ফার্মের অসাধু কিছু কর্মী ডিম পাচারের সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন। এমনটাই অভিযোগ জেলা প্রশাসনের একাংশ থেকে শুরু করে ফার্মের কিছু সৎকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁদের আরও অভিযোগ, ওই আধিকারিকের মাথার উপর কলকাতার কয়েকজন বড় কর্তার আশীর্বাদ রয়েছে। কারণ, ফার্ম পরিচালনার পুরো বিষয়টি কলকাতা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়।
শালবনীর বিজেপি বিধায়ক বিমান মাহাতও সরকারি ফার্ম থেকে ডিম পাচারের ঘটনায় বেশ বিচলিত। তিনি এদিন ফোনে বলছিলেন, ‘ডিম পাচারের ফলে প্রতিমাসে সরকারের অন্তত ১৮-২০ লক্ষ টাকা বা তার থেকেও বেশি ক্ষতি হয়েছে। বছরে কমপক্ষে ২-৩ কোটি টাকা লুট! তৃণমূল আমল থেকেই এই লুটের কারবার চলছে।’ যদিও মমতা-তৃণমূলের নেতা মহম্মদ রফিকের পাল্টা দাবি, ‘আমাদের আমলে কড়া নজর রাখা হতো। বিজেপির আমলেই এই কারচুপি ধরা পড়ল। সঠিক তদন্ত হলে সব পরিস্কার হয়ে যাবে।’ সিপিএমের জেলা সম্পাদক বিজয় পাল ও কংগ্রেস নেতা মহম্মদ সাইফুল বলেন, ‘ছোটখাটো কর্মীদের যেন বলির পাঁঠা না করা হয়, রাঘব বোয়ালদের ধরতে হবে।’ শেষপর্যন্ত কি সরকারি ওই ফার্মের ‘ঘুঘুর বাসা’ ভাঙবে? নাকি বড় কর্তাদের অঙ্গুলি হেলনে ধামাচাপা পড়ে যাবে তদন্ত? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জেলায়। নিজস্ব চিত্র