পরামর্শে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট আয়ুর্বেদিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের প্রাক্তন অধ্যাপক ডাঃ প্রদ্যোত্ বিকাশ কর মহাপাত্র
পরামর্শে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট আয়ুর্বেদিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের প্রাক্তন অধ্যাপক ডাঃ প্রদ্যোত্ বিকাশ কর মহাপাত্র
স্থূলত্ব বা মেদ হল এক ধরনের অসুখ বা ব্যাধি। নিয়মিত লেবু খেলে এই অসুখ সারানো অবশ্যইসম্ভব। প্রশ্ন হল কীভাবে লেবু খাবেন? কোন লেবুই বা খাবেন? লেবু নিত্য প্রয়োজনীয় ফলের মধ্যেই পড়ে। শুধু যদি পাতি লেবুর কথা বলি, তাহলে আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে লেবুর উত্পাদন হয়। বঙ্গ দেশের গ্রামীন এলাকায় ঘরে ঘরে লেবু গাছ রয়েছে।
লেবু খুব বেশি দামি ফল নয়, অথচ উপকারের প্রাচুর্যে পূর্ণ! আযুর্বেদ শাস্ত্রে লেবুকে ফল হিসেবে খাওয়ার পরামর্শ যেমন দেওয়া হয়েছে তেমনই ওষুধ তৈরির উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
কখনও কখনও কিছু কিছু ওষুধ শোধন করতেও ব্যবহার করা হয়। লেবু ব্যবহার করা হয় পথ্য কিংবা অনুপান হিসেবেও। অনুপান অর্থাত্ বিভিন্ন ওষুধের সঙ্গেও লেবু খেতে দেওয়া হয়। একইভাবে ওজন কমাতেও লেবুর রস ব্যবহার করা হয়। একটি প্রমাণ সাইজের
লেবুর রসে কার্বোহাইড্রেট থাকে মাত্র ৬ গ্রাম। আবার ডায়েটরি ফাইবার থাকে ২ গ্রাম। ভিটামিন সি থাকে ৩৪ মিলিগ্রাম। ফ্যাট থাকে না। প্রোটিন থাকে ১ গ্রাম। কোলেস্টেরল একেবারেই থাকে না। সুতরাং একটা প্রমাণ সাইজের লেবু থেকে আমরা প্রায় ১৯ ক্যালোরি শক্তি পেতে পারি।
অতএব লেবু খেলে শরীরে ফ্যাটের মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা থাকে না। এছাড়া লেবুতে থাকে সাইট্রিক অ্যাসিড, কার্বক্সিলিক অ্যাসিড। থাকে ১০টির মতো ফ্ল্যাভোনয়েডস। ফ্ল্যাভোনয়েডস-এর অনেকগুলি ঔষধি উপকারিতা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিক্যান্সার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি এবং অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য।লেবুতে মেলে একই সংখ্যক ফেনোলিক অ্যাসিড ও।
এইসব উপাদানগুলি ইমিউন বুস্টিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। অর্থাত্ ইমিউনিটিকে বাড়ায়। তার কী উপকার তা নিয়ে পরে বিস্তারিতভাবে কথা বলছি।
লেবু মেটাবলিক বুস্টিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। অ্যাডিপোসাইটস বা ফ্যাট সেল তৈরি করতে দেয় না। একইসঙ্গে লাইপোলাইসিস করে। অর্থাত্ আমাদের এই লিপিডকে ভেঙে দিতে পারে। এইভাবে অনাবশ্যক ফ্যাটকে কমিয়ে দেয়।
এই ফল আমাদের স্ট্রেস কমাতেও সাহায্য করে। মনে রাখতে হবে,
স্ট্রেস থেকে আসে ডিসট্রেস বা মনোদৈহিক বেদনা এবং সেখান থেকে আসে ডিপ্রেশন।
ডিপ্রেশন থাকলে অনেকক্ষেত্রেই একজন ব্যক্তি প্রয়োজন অনুসারে শারীরিকভাবে সক্রিয় হতে পারেন না। কায়িক শ্রমের অভাবে শরীরে বাড়ে ফ্যাটের মাত্রা। সুতরাং যদি ডিপ্রেশন এবং স্ট্রেস কমান যায় তাহলেই দেহের ফ্যাটও অনেকাংশে কমতে থাকে। কমতে থাকে ওজন। সেই কারণে যাঁদের বেশি ওজন আছে অথচ ডিপ্রেশনে ভুগছেন তাঁরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা জটিলতায় ভোগেন। শারীরিকভাবে কাজকর্ম কম করেন। মেদ ঝরে না। সেক্ষেত্রে মন থেকে যদি ডিপ্রেশন সরিয়ে ফেলা যায় তাহলেই তিনি কাজকর্ম শুরু করতে পারবেন। ক্রমশ শরীর থেকে মেদ ঝরতে শুরু করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সংক্রান্ত কিছু কিছু বিষয়ের জন্যেও শরীরে জমে ফ্যাট। এই ধরনের ইমিউনোলজিক্যাল সমস্যার প্রভাব পড়ে বিপাকীয় কাজে তথা বিপাকীয় ক্রিয়ার জন্য নিযুক্ত সবচাইতে বড় অর্গ্যান লিভারেও! ফলে একজন ব্যক্তি নানা ধরনের লিভার ডিজিজ-এ ভুগতে থাকেন। তাই কোনওভাবে একজন ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা গেলে ক্রনিক লিভার ডিজিজ হওয়াও প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিপাকীয় ক্রিয়ার বৃদ্ধিও সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেহে অবাঞ্ছিত ফ্যাট জমবে না। আগেই বলা হয়েছে লেবুতে রয়েছে যথেষ্ট মাত্রায় অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাভোনয়েডস। ফলে বোঝাই যাচ্ছে কেন বারংবার ডায়েটে প্রতিদিন লেবু যোগ করার কথা বলা হচ্ছে!
উষ্ণবীর্য লেবু
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারে, আমাদের দেহের বায়ু-পিত্ত-কফের ভারসাম্য বিঘ্নিত হলেই দেখা দেয় নানা ধরনের অসুস্থতা।
এগুলির মধ্যে কফের সমস্যা হলে শরীরে ক্লেদ বা দূষিত কফ যা পরে মেদের আকারে জমে যায়। সেক্ষেত্রে কফনাশক উপাদান হিসেবে লেবু খাওয়া যায়। কারণ লেবু উষ্ণবীর্য বা দেহের উষ্ণতা বাড়ায়। ফলে কফ গলাতে সাহায্য করে। এই কারণেই কফনাশক দ্রব্য হিসেবে লেবু খুব ভালো কাজ করে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে, কেন ছোটবেলা থেকে মা-ঠাকুমারা কফ, কাশি হলে লেবু খেতে বলতেন। কারণ তা কফ তুলে দিতে সাহায্য করে।
আবার উষ্ণবীর্য বলেই লেবুর পাচাকাগ্নিকেও উদ্দীপিত করার ক্ষমতা আছে। নিয়মিত লেবু খেলে তা দ্রুত খাদ্য হজম করাতে সাহায্য করে বা দীপক ও পাচক হিসেবে কাজ করে। এমনকী নিয়মিত লেবু খেলে তা অজীর্ণ-আমাশাও প্রতিরোধ করে।
নিয়মিত লেবু খেলে তা বায়ু নাশ করতেও কাজে আসে। দেখা গিয়েছে দেহে বায়ুর আধিক্য হলে তখন তা নিউরোমাস্কুলোস্কেলিটাল বা অস্হি- স্নায়ু-পেশি সংক্রান্ত নানা জটিলতাও তৈরি হয়। এই ধরনের সমস্যা এড়াতে বা বাতনাশক হিসেবেও কাজ করে লেবু। তাছাড়া ওজন কমায় বলে মাত্রাতিরিক্ত দৈহিক ওজনের কারণে বাতরোগ জটিল হওয়াকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
হজমের সমস্যা এবং মেদ বৃদ্ধি
সঠিকভাবে খাদ্য হজম না হলে তখন শরীরে অপক্ব অন্ন রস তৈরি হয় যাকে বলে আম দোষ। এই আম দোষ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জমতে থাকে ও শরীরের নানা কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এর ফলশ্রুতি হল মেদ বৃদ্ধি। এই অপক্ব অন্নরস জমা হওয়াকে রোধ করা বা স্রোত শোধন করতে পারলে তখন শরীরের অঙ্গগুলি সঠিকভাবে পুষ্টি উপাদান পেতে শুরু করে। একইসঙ্গে শরীর থেকে অপক্ব অন্নরস সঠিকভাবে বেরিয়েও যায়। ফলে শরীরে মেদও জমে না।
পাতিলেবু কীভাবে খেলে পাবেন উপকার
• ঈষদুষ্ণ জলে পাতি লেবুর রস মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খাওয়া যায়। তবে এরপর শারীরিক পরিশ্রম অবশ্যই করতে হবে। এছাড়া লেবুর রস খাওয়া যায় সৈন্ধব লবণ মিশিয়েও। খেতে পারেন শুকনো আদা দিয়েও। গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়েও লেবুর রস খাওয়া উপকারী প্রমাণিত হতে পারে।
• দুধ গরম করে তার মধ্যে পাতি লেবুর রস মিশিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পান করলেও ওজন কমতে পারে।
• এছাড়া লেবুর ক্লিনজিং এফেক্ট আছে। ফলে শরীরের যেখানে যেখানে মেদ বা ক্লেদ জমে থাকার আশঙ্কা থাকে, সেইসব অংশ থেকে মেদ বের করে আনতে পারে।
• দুপুরে ভাতের সঙ্গে প্রতিদিন পাতি লেবুর রস খেলে লাঞ্চ দ্রুত হজম হবে। এর ফলে শরীরের ফ্রিরেডিক্যালস ও তৈরি হবে কম। এমনকী পেটে গ্যাসের সমস্যা থাকলে তাও যাবে কমে।
কারা লেবু খাবেন না
যাঁদের পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড কম তৈরি হয় বা মন্দ্যাগ্নি রয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রে লেবু খুব কার্যকরী। তবে যাঁদের ইতিমধ্যেই অ্যাসিডের আধিক্য বেশি, বা তীক্ষ্ণাগ্নি রয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রে লেবু খাওয়া সঠিক নয়। তাই অগ্নিবল বিচার করে তবেই লেবু খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবার যাঁদের অ্যাক্টিভ গ্যাস্ট্রাইটিস বা আলসার রয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রেও লেবু দেওয়া যাবে না। কারণ তাঁদের পাকস্থলীতে খুব জোরদার প্রদাহ আছে। সেক্ষেত্রে লেবু খেলে ভালোর বদলে খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক