সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: রায়পাড়ার সুশীলবরণ রায়। ১৪ বছর ধরে ডিএসপির ঠিকা শ্রমিক। পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধা মা ও বেকার পুত্র। এতদিন রোজগেরে সদস্য ছিলেন তিনি একাই। বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার চালু হওয়ার পর কারখানার গেট থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাঁর গেট পাস। কর্মহীন রায় পরিবারে দুর্গাপুজোর নতুন পোশাক কেনা এখন বিলাসিতার সামিল।
অনিমেষ ধীবর। শ্বশুর বাড়িতে থেকেই ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ডিএসপির ঠিকা শ্রমিক হিসাবে কর্মরত। পরিবার বৃদ্ধ শ্বশুর, শাশুড়ি ছাড়াও নাবালক সন্তানরা রয়েছে। তিনিও কাজ হারিয়ে অথৈই জলে। মা দুর্গা মর্তে আসছেন। চারিদিকে আনন্দঘন পরিবেশ। অথচ, হাসি নেই ধীবর পরিবারে।
সুশীলবরণ ও অনিমেষ উদাহরণ মাত্র। এরকম শ’য়ে শ’য়ে শ্রমিক পরিবারে একই অবস্থা। কারও গেট পাস কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কাউকে আবার ঠিকাদার বলে দিয়েছেন কাজে না আসতে। কারও সন্তান মাধ্যমিক দিচ্ছে। কারও সন্তান আরও ছোট। ‘সবকা বিকাশে’র জমানায় আতান্তরে পড়েছে পরিবারগুলি।
অভিযোগ উঠছে, সরকার বদলের পর স্টিল দুর্গাপুরে যেন আতঙ্কের পরিবেশ। ডিএসপি হোক বা এএসপি। কারখানার গেটের সামনে প্রায় দিনই চলছে দুষ্কৃতী তাণ্ডব। নিজেদের স্থানীয় বেকার যুবক দাবি করে শ্রমিকদের কাছ থেকে গেট পাস কেড়ে নিচ্ছে তারা। এ নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনওপ্রকার উচ্চবাচ্য করছে না। কর্মহীন হয়ে পড়ছেন বহু বছর ধরে কাজ করা শ্রমিকরা। শিল্পাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি কারখানার গেটে লাগামছাড়া অরাজকতা চললেও সিআইএসএফ বা পুলিশ নীরব দর্শক। এমনটাই অভিযোগ। স্বাভাবিকভাবেই ঠিকাশ্রমিক ও তাঁদের পরিবারে চরম আতঙ্কে। যাঁরা এখনও দুরুদুরু বুকে কাজে যাচ্ছে, তাঁদের চাকরি আর কতদিন থাকবে, সেটাও কেউই জানেন না। ফলে, এবারের শিল্পাঞ্চলের পুজোয় বিষাদের ছায়া।
২০১৫ সালে ডিএসপিতে গড়ে ওঠে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট কন্ট্রাক্টর এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন। অরাজনৈতিক এই শ্রমিক সংগঠন ডিএসপি কর্তৃপক্ষর কাছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনেছেন। তাঁদের দাবি, তাঁদের সংগঠনের ১১৩ জন সদস্যকে বিনা কারণে ডিএসপি থেকে ছাটাই করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ আইন বিরুদ্ধ। নাম না করে তাঁরা হঠাৎ শক্তিশালী হয়ে ওঠা একটি শ্রমিক সংগঠনকে আক্রমণ করেছে। তাঁদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুভাষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘রাজ্যে সরকার বদলে পর একটি শ্রমিক সংগঠনের প্রশ্রয়ে কারখানার গেটে তাণ্ডব চলছে। আমাদের সংগঠন থেকে লিখিত অভিযোগ করায় আমাদের নেতাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে। যাঁরা ডিএসপি কারখানায় দাদাগিরি করছে সেই সংগঠনের বৈধ স্বীকৃতিই নেই। অবৈধ শ্রমিক ছাটাই নিয়ে কেন্দ্রীয় লেবার কমিশন ও মহকুমা শাসকের কাছে অভিযোগ করেছি।’
একই অভিযোগ সিটুর। সিপিএমের এই শ্রমিক সংগঠনের নেতা বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এএসপি থেকে ২০০ ও ডিএসপি থেকে ৩০০ জন শ্রমিক কর্মহারা হয়েছেন। আমরা প্রশাসনের সর্বস্তরে অভিযোগ করেছি। শনিবারও ডিএসপি কারখানার গেটের কাছ থেকে শ্রমিকদের গেটপাস কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পুজোর সময়ে শ্রমিক পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।’
আইএনটিইউসি জেলা সভাপতি সুভাষ সাহা বলেন, ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার হলে দুর্গাপুরবাসী চাকরি পাবে স্বপ্ন দেখেছিল। এখন চাকরিহারা হচ্ছেন শ্রমিকরা। আমাদের বহু শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন বিজেপির আশ্রিত দুষ্কৃতীদের তাণ্ডবে।’
বিএমএসের জেলা সম্পাদক মৃন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ঠিকাদারদের বলা হয়েছিল বহিরাগত, তৃণমূলের দুষ্কৃতীদের কাজে রাখা যাবে না। তাঁরা সেকথা শোনেননি। সাধারণ মানুষকে কাজ দেওয়া হয়নি। তারাই কারখানার গেটে সামনে বিক্ষোভ করছে। তৃণমূলের আমলে যাঁরা অত্যাচার করেনি তাঁদের আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। যে সংগঠনের কথা বলছেন, তোলামূলদের নিয়ে নতুন করে অশান্তি করার চেষ্টা করছে।’