রঙ্গন বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: বহিরাগতদের চোখরাঙানি। পুলিশের হুমকি। স্থানীয়দের বাধা। ত্রিপল টাঙিয়ে মাথা গোঁজার একটা জায়গা তুলতে গেলেও প্রাণনাশের হুমকি। ছিন্নমূল মানুষগুলি দিশাহারা, আতঙ্কিত। অবস্থা অবর্ণনীয়, অসহনীয়। তবে কেউ না থাকুক বাঙালির একজন দুর্গা আছেন। তিনি হলেন সহায়। তিনিই দিলেন পথ। তিনিই যেন ফিসফিস করে শিখিয়ে গেলেন পুজো শুরু কর। একত্র হও, শক্তিশালী হয়ে ওঠো।
ছিন্নমূল মানুষগুলি দেবীর শরণ নিলেন। শুরু করলেন পুজো। দশ ঘর এক উঠোন হয়ে উঠল একটি পরিবার। ছন্নছাড়া কলোনি একত্রিত হয়ে শুরু করল দুর্গাপুজো। সমবেত হলেন সবাই। চোখরাঙানি স্বাভাবিকভাবেই গেল কমে। এ কোনো জমিদার বাড়ির স্বপ্নাদেশ পাওয়া দুর্গাপুজোর গল্প নয়। এ হল দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কলোনির ছিন্নমূল মানুষের অস্তিত্বরক্ষার লড়াই। যে পুজো শুরু হল নামমাত্র টাকায় আর অগাধ পরিশ্রমে, সে পুজোই হয়ে উঠল কলোনির আত্মা। আশপাশে যতই বড়ো বাজেটের পুজো এখন হোক। নিজের কলোনির সেই প্রাণের পুজোয় অঞ্জলি না দিলে শান্তি হয় না। ৭০ বছর পরও সে টান অমোঘ। ‘সে ভক্তি ছিন্ন হয়নি কোনোদিন, জীবিত থাকাকালীন হবেও না,’ বললেন কলোনি আন্দোলনের সামনের সারির যোদ্ধা দীনেশ বাগ। তাঁর বয়স ৮০ পেরিয়েছে। এখন শরীর চলে না। লাঠি হাতে হাঁটেন। লাঠি ঠুকঠুক করতে করতেই আসেন অঞ্জলি দিতে।
ছেচল্লিশে দাঙ্গার আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে এক কাপড়ে ছেলে, বউকে নিয়ে ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় এসেছিলেন দীনেশবাবু। টালিগঞ্জের নেতাজি নগরে ছিটে বেড়া ও খড়ের ছাউনির ছোট্ট ঘরে আশ্রয় জুটিয়েছিলেন। ৭৭ বছর আগে কলোনির বাসিন্দাদের নিয়ে দুর্গাপুজো শুরু করেছিল কলোনি কমিটি। দীনেশ বলেন, ‘এ পুজোর সঙ্গে আমার নাড়ির যোগ।’ টালিগঞ্জের গান্ধী কলোনির সনাতন পাল। ৭০ বছর আগে কলোনিতে ঘর তুলতে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা। স্থানীয় গুন্ডারা মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। তাই সনাতন ছোটো থেকেই কলোনি কমিটির মেম্বার। ঠাকুর আনতে যেতেন। চাঁদা কাটতেন। ভোগ পরিবেশন করতেন। আজ আইটি সংস্থার চাকুরে। নিউটাউনের ফ্ল্যাট কিনেছেন। কিন্তু পুজোর চারদিন কলোনির পুজোয় না থাকলে মনে হয় না পুজো এসেছে।
দেশভাগের যন্ত্রণা। উদ্বাস্তু জীবনের লড়াইয়ে জিততে আজ থেকে সত্তর, আশি বছর আগে শুরু হয়েছিল কলোনির পুজোগুলি। মূলত দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ, রানিকুঠি, নেতাজিনগর, বাঁশদ্রোণী, বিজয়গড়ের মতো এলাকায় পূর্ববঙ্গ থেকে সব হারিয়ে ছিন্নমূল হয়ে আসা মানুষগুলি কলোনি কমিটি গড়ে তুলেছিলেন। এই কমিটিগুলিই একত্র হওয়ার তাগিদে, অস্তিত্বের লড়াই চালানোর স্বার্থে ও আনন্দের সন্ধানে শুরু করেছিলেন দুর্গাপুজো। তা এখনও মনের পুজো, প্রাণের টান তাকে ঘিরেই।
নেতাজি নগরের বাস্তুহারা সমিতি ও পুজোর সম্পাদক পীযূষ শূর বলেন, ‘অনেক কলোনির পুজো প্রায় বন্ধ হতে চলেছে। আমরা মানুষকে সঙ্গে নিয়েই পুজো করি। এবার ভাবনা ‘মায়ের আঁচল’। মানে আশ্রয়। কোনো কর্পোরেট ডোনেশন নয়, স্রেফ এলাকার মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা নিয়ে পুজো হয়। নেতাজিনগরের মধ্যে ১১টি ওয়ার্ড পড়ে। আলাদাভাবে অনেক পুজো হয়। কিন্তু এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি আমাদের মণ্ডপেই দেন।’ বাসিন্দা রামচন্দ্র লেট বলেন, ‘কলোনি কমিটির পুজোগুলির সঙ্গে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকা মানুষগুলির লড়াই মিশে। তাই থিমের হাতছানি নয় উৎসবের চারদিন এখানেই থাকতেই আনন্দ।’
সংগ্রামের ঐতিহ্য ও আটপৌরে আন্তরিকতার মিশেলে আজও হীরের মতো ঝকঝক করে কলোনির পুজো। এখানে দুর্গা ফিসফিস করে একত্রিত হওয়ার মন্ত্র শুনিয়ে গিয়েছিলেন। দুর্গা তাই গোটা বাংলার মতো কলেনিরও মেয়ে।



