সংবাদদাতা, তেহট্ট: একদিকে কাঁটাতারের বেড়া, অন্যদিকে দুর্গামণ্ডপ। মাঝখানে ব্যবধান মাত্র ১৫ ফুটের। বেড়ার ওপারে অন্য দেশ, এপারে উৎসবের আবহ। সীমান্তে কড়া নজরদারির মধ্যেই ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ, মণ্ডপে উচ্চারিত হয় দেবীর অঞ্জলির মন্ত্র। আর সেই উৎসবে গ্রামবাসীদের পাশে এসে দাঁড়ান সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) জওয়ানরা। অষ্টমীর অঞ্জলি থেকে প্রসাদ বিতরণ, এমনকি বিসর্জনের আয়োজনেও তাঁদের উপস্থিতি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের তেহট্ট থানার ভাটুপাড়া গ্রামের দুর্গাপুজোয় এভাবেই মিলেমিশে যায় কর্তব্য আর উৎসব, সীমান্তের কঠোরতা আর মানুষের আন্তরিকতা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাটুপাড়ার এই দুর্গাপুজোর ইতিহাস প্রায় দেড়শো বছরের। স্থানীয়দের দাবি, ১৮৬৭ সালে মেহেরপুরের জমিদার সুভাষ বসু এই পুজোর সূচনা করেন। তখনও দেশভাগ হয়নি, সীমান্তের কাঁটাতারও ছিল না। কথিত আছে, জমিদারবাড়ির পুজোয় যোগ দিতে গ্রামবাসীদেরজঙ্গলঘেরা পথ পেরিয়ে যেতে হত। পথে বন্যপ্রাণীর ভয়ও ছিল। প্রজাদের সেই দুর্ভোগের কথা ভেবেই ভাটুপাড়া গ্রামে দুর্গাপুজোর আয়োজন শুরু করেন জমিদার।
দেশভাগের পরে বদলে যায় এলাকার ভূগোল। যে গ্রাম একসময় অবিভক্ত বাংলার স্বাভাবিক জনজীবনের অংশ ছিল, সেখানে পরে তৈরি হয় আন্তর্জাতিক সীমান্ত। গ্রামের ভিতরে থাকা পুজোমণ্ডপও চলে আসে কাঁটাতারের বেড়ার একেবারে কাছে। স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তে বেড়া বসানোর সময় মন্দিরটি অক্ষত রাখা হয়। বর্তমানে ১২৫ ও ১২৬ নম্বর সীমান্তপিলারের মাঝখানে, কাঁটাতার থেকে মাত্র ১৫ ফুট দূরে রয়েছে মন্দিরটি। ফলে ভাটুপাড়ারদুর্গাপুজো এখন শুধু একটি গ্রামের ঐতিহ্য নয়, সীমান্ত এলাকার জীবনযাত্রারও এক বিশেষ পরিচয়।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক সম্প্রীতির ইতিহাসও। গ্রামবাসীদের কথায়, মন্দিরের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গোপাল দাস বৈরাগ্যের নামও জড়িয়ে রয়েছে। একসময় আর্থিক অনটনের কারণে পুজো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে পাশের মোবারকপুর, লালবাজার ও ইলসেমারির মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁদের সহযোগিতায় পুজো চালিয়ে যাওয়ার পথ সহজ হয়। সেই থেকে ভাটুপাড়ারপুজোয় ধর্মের পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে পারস্পরিক সহযোগিতা ও গ্রামের ঐক্য।
পুজোর চার দিন বিএসএফ জওয়ানদের অংশগ্রহণ এই উৎসবকে অন্য মাত্রা দেয়। সারা বছর সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে থাকলেও পুজোর দিনগুলিতে গ্রামবাসীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন তাঁরা। অষ্টমীর অঞ্জলিতে যোগ দেওয়া, প্রসাদ বিতরণ কিংবা বিসর্জনের সময় গ্রামবাসীদে রসীমান্তের রাস্তা দিয়ে যাতায়াতে সহযোগিতা করা—সবেতেই দেখা যায় তাঁদের। তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সীমান্তের নিরাপত্তার দায়িত্বও সমান গুরুত্ব দিয়ে পালন করেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা নিরঞ্জন বিশ্বাস, সরোজ শিকদার ও মদন ঘোষ বলেন, এই পুজোর সঙ্গে গ্রামের বহু প্রজন্মের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। এখন বিএসএফের জওয়ানরাও আমাদের পুজো পরিবারের অংশ হয়ে গিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে আমাদেরও ভাল লাগে।
কাঁটাতারের বেড়া দেশকে আলাদা করেছে, বদলে দিয়েছে গ্রামের মানচিত্র। কিন্তু ভাটুপাড়ার দুর্গাপুজোয় সেই বিভাজনের মাঝেও অটুট রয়েছে মানুষের সম্পর্ক। দেড়শো বছরের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে তাই প্রতি শরতে এই সীমান্ত গ্রামে দেবীবন্দনার পাশাপাশি নতুন করে উদযাপিত হয় সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার উৎসব।



