সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: আন্দোলন চলছেই। ককরোচ হোক, বাম বা কংগ্রেস। নামটা প্রাসঙ্গিক থাকছে না। কাতারে কাতারে মানুষ শুধু নেমে পড়ছে রাজধানীর রাজপথে। জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ছাপিয়ে এখন লক্ষ্য একটাই—নেপথ্য মাথার অপসারণ। কেন্দ্রের দমন নীতি, গণপরিবহণ স্তব্ধ করে রাখা, কিংবা হাজারে হাজারে আটক। তারপরও পথে নামছে মানুষ। মিছিল হোক বা অভিযান, বিক্ষোভ চলছে লাগাতার। সোমবারও পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বাধা, বারাখাম্বায় ব্যারিকেড, বিএনএসএসের ১৬৩ ধারার সতর্কতা... কোনো কিছুই আটকাতে পারল না জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন। ‘চলো দিল্লি’র ডাকে প্রতিবাদের সেই ঢেউ আছড়ে পড়ল সুপ্রিম কোর্টের অভিমুখে।
কনট প্লেস, বারাখাম্বা রোড, ভগবান দাস রোড, অশোক রোড, ফিরোজ শাহ, মান্ডি হাউস জুড়ে শুধু শোনা গেল জনতার পদধ্বনি। দেখা গেল কালো মাথার স্রোত। পুলিশের পাঁচস্তরীয় লোহার ব্যারিকেডও আটকাতে পারল না। বিক্ষোভকারীরা টপকে পেরলেন। উত্তাল হল এলাকা। চলল পুলিশের ধরপাকড়। তারপরও রাহুল-প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, নেহা বোরা, অখিলেশ যাদব, তেজস্বীর সঙ্গে পা মেলালেন আইনজীবী থেকে আম আদমি। বাম-কংগ্রেসের ছাত্র-যুব সংগঠনের তাজা রক্তের তরুণদের মুখে চলল স্লোগান—‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়’, ‘ভোট চোর কাঁহা মিলেগা/বিজেপিকে দপ্তর মে’।
এই সুর অবশ্য বাঁধা হয়ে গিয়েছিল এদিনই, কনস্টিটিউশন ক্লাবে। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতানেত্রীরা একজোট হয়ে শপথ নিয়েছিলেন—থামলে চলবে না। তার আগে ছিল রাহুল গান্ধীর সাংবাদিক সম্মেলন। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের স্নায়ুর চাপ বাড়িয়ে তিনি ঘোষণা করে দিলেন, ‘সরকারের অন্দরের খবর আগের থেকে অনেক বেশি পাচ্ছি। ২০০ সরকারি অফিসার নিত্য যোগাযোগ রাখছেন। যেভাবে ভোটচুরির মাধ্যমে সংবিধানকে অপমান করে গণতন্ত্র ধ্বংস করছেন মোদিজি, অমিত শাহজি, অজিত দোভাল, মোহন ভাগবতরা, তা ধরা পড়ে গিয়েছে। তাই প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে পুলিশ দিয়ে দিল্লিকে দুর্গ বানিয়ে ফেলেছে। পুলিশ দিয়ে তরুণদের মার খাওয়ানো হচ্ছে। অথচ ছাড় পেয়ে যাচ্ছে বিজেপি-আরএসএসের গুন্ডারা। যাই করুক, যতদিন না মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদ ছাড়ছেন, তরুণরা থামবে না।’ তাঁর সাফ কথা, ‘ঘুম উড়ে গিয়েছে জ্ঞানেশের। মেসেজ করছেন তিনিও। তবে এখন শুধু একা জ্ঞানেশ নন, নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহকেও ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য মানুষ রাস্তায় নামছে। তাই জ্ঞানেশ কুমারকে বলছি, রাজসাক্ষী হয়ে যান। আপনি করেছেন। কিন্তু কারা করিয়েছে আপনাকে দিয়ে? মাথা কারা? তাই যা করানো হয়েছে, বলে দিন।’
তারপর পথে নামার পালা। কনস্টিটিউশন ক্লাব থেকে বাসে চেপে বারাখাম্বা রোড-কনট প্লেস ক্রসিং। সঙ্গে চলল প্রতিবাদী মানুষের ঢেউ। সেখান থেকে মিছিল করে সুপ্রিম কোর্ট। এসআইআরে নাগরিকের নাম বাদ যাওয়ার প্রতিবাদে দায়ের হল মামলা। বিকাল ৪টে ৩৭ মিনিটে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রিতে দায়ের হল আবেদন। বাদী—রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়্গে সহ ১০ বিরোধী দলের ১১ জন নেতানেত্রী। বিবাদী—নির্বাচন কমিশন, জ্ঞানেশ কুমার, সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি। সন্ধ্যায় পুলিশের বাধা পেরিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রিতে পৌঁছান রাহুল, অখিলেশরা।
প্রথমে ঠিক হয় ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’র (কেন্দ্র) বিরুদ্ধেও মামলা হবে। কিন্তু পরে বাদ দেওয়া হয়। রাহুলের তরফে এআইসিসির অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইনচার্জ গুরদীপ সিং সপ্পল হলফনামায় সই করার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুরোধ করেন। কিন্তু তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর ইস্যুতে আগেই আমার মামলা রয়েছে। তাই এটায় অন্য কাউকে সই করতে হবে।’ তবে রেজিস্ট্রি সূত্রে খবর, রাহুলদের মামলায় ১৪টি ত্রুটি রয়েছে, কিছু নথিও জমা পড়েনি। তাই এখনও শুনানির জন্য এটি তালিকাভুক্ত হয়নি।
বিকালে কলকাতা যাওয়ার বিমান ধরার তাড়া থাকায় কনস্টিটিউশন ক্লাব থেকেই চলে যান মমতা। খাড়্গে-রাহুলকে জানিয়েই। ফলে ছিলেন না মিছিলে। তবে মহুয়া মৈত্র, সাগরিকা ঘোষ, নাদিমুল হকরা ছিলেন। কংগ্রেসের তিন মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার, সুখবিন্দর সুখু, রেবন্ত রেড্ডির পাশাপাশি অধীররঞ্জন চৌধুরী, অশোক গেহলটের মতো নেতারাও শামিল হন। রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, ‘আন্দোলন চলবে। এক একদিন এক একরকম। কোনোভাবেই মোদি-শাহ, জ্ঞানেশ কুমারকে নিশ্চিন্ত হতে দেব না।’



