সবুজ বিশ্বাস, জঙ্গিপুর: শারদোৎসবের দিনকয়েক আগে হঠাৎই ঘটে এক অলৌকিক কাণ্ড। প্রায় দেড়শো বছর আগে নায়েব বাড়ির ছাদে বাঁধা ছিল একটি হরিণ। আচমকা সেটি লাফিয়ে পড়ে নিচে। মারাও যায় সঙ্গে সঙ্গে। বাড়ির প্রবীণদের বিশ্বাস জন্মায় এ সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়, মা আদ্যাশক্তি বলি চাইছেন। সেই ঘটনার পর থেকেই বদলে গিয়েছিল বাড়ির পুজো আচার। যুক্ত হয়েছিল পাঁঠাবলির নিয়ম। সময়ের চাকা ঘুরে আজও সেই নিয়মের এতটুকুও ভাটা পড়েনি জঙ্গিপুরের বিখ্যাত নায়েব বাড়ির পুজোয়। ঐতিহ্য আর নিষ্ঠা মেনে দুর্গাপুজোয় হয় পাঁঠাবলি।
সময়টা ১৮৮২ সাল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নায়েব অমরনাথ মুখোপাধ্যায় ভাগীরথী নদীর পাড়েই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঐতিহাসিক নায়েব বাড়ি। ভিতরে মায়ের মন্দির।সেই মন্দিরের ছাদে দু’টি সিংহের মূর্তি। নায়েব বাড়ি প্রতিষ্ঠার সাত বছর পর, অর্থাৎ ১৮৮৯ সাল থেকে শুরু হয় পারিবারিক দুর্গাপুজো। প্রতি বছর ষষ্ঠীর দিন বেলতলায় পুজো ও ঘট ভরে দালানবাড়ির সামনে সাজিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পুজোর সূচনা হয়। পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, ওই বেলগাছ থেকেই নাকি এককালে ব্রহ্মদৈত্য নেমে আসত পুজোমণ্ডপে। সময় বদলালেও নায়েব বাড়ির নিজস্ব রীতি-নীতিতে ছেদ পড়েনি আজও। প্রতি বছর সপ্তমীর দিন একটি, অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় দুটি এবং নবমীতে দু’টি পাঁঠা নিয়ম মেনে বলি দেওয়া হয়। বলি দেওয়া হয় একটি চালকুমড়োও। মায়ের কাছে ভোগ নিবেদনেও রয়েছে বিশেষত্ব—পুজোর ক’দিন দেবীকে দেওয়া হয় লুচি, পায়েস, পোলাও ও বলি দেওয়া পাঁঠার মাংস। নমবীতে দেওয়া হয় ইলিশ মাছের ভোগ। এছাড়া অষ্টমীর দিন ১০৮টি বেলপাতা, ১০৮টি প্রদীপ এবং ১০৮টি বাতাসা দিয়ে হয় বিশেষ আরাধনা। বসে কুমারী পুজোর আসরও। জঙ্গিপুরে নায়েব বাড়ির পুজোকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়। মায়ের দর্শন ও আশীর্বাদ পেতে বহু দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন।
মুখোপাধ্যায় পরিবার পালা করে এই দেবীর আরাধনা করে থাকে। পরিবারের বর্তমান সদস্য মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘প্রাচীন প্রথা মেনে দশমীর দিন ঘট বিসর্জনের পর বাড়ির বাইরে একটি বড় গামলায় জল ভরে রাখা হয়। সেই জলে ছায়া দেখেই নাকি ভক্তরা মা দুর্গার মুখ দেখতে পান। এরপর কোনো আধুনিক ট্রলি নয়, প্রাচীন ঐতিহ্য বজায় রেখেই বাঁশের মাচায় কাঁধে করে নিরঞ্জনে নিয়ে যাওয়া হয় প্রতিমাকে।’ নায়েব বাড়ি আজও ঔপনিবেশিক শাসনের সাক্ষী। সাক্ষী বাংলার প্রাচীন দুর্গোপুজোরও।



