


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: কাঁধের উপর ‘নিথর দেহ’। খাটিয়া বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন চারজন। কিন্তু নেই স্বজন হারানোর কান্না। বরং শ্মশানযাত্রীদের হাতে আবির, পরনের পোশাকে রঙের ছোপ। চারপাশ থেকে আসছে খোল-করতালের শব্দ। যেন উৎসবের আমেজ। সিউড়ি-১ ব্লকের মল্লিকপুর পঞ্চায়েতের উত্তর রায়পুর গ্রামে দোল পূর্ণিমার পরের দিন বুধবার এভাবেই এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি হয়। শোক আর উৎসব যেখানে মিলেমিশে একাকার, স্থানীয় ভাষায় যার নাম ‘ধুলুরী’।
প্রতি বছর দোল উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই এক প্রাচীন লোকবিশ্বাসের টানে মেতে ওঠেন গ্রামের বাসিন্দারা। শোকের আবহে নয়, বরং উন্মাদনার সঙ্গে চলে এই ‘শবযাত্রা’। উৎসবের সকালে গ্রামজুড়ে চলে নাম সংকীর্তন। বেলা গড়াতেই ভিড় জমে স্থানীয় শ্মশানে। সেখানেই শুরু হয় ‘মৃতদেহ’ সাজানোর বিচিত্র প্রস্তুতি। শ্মশানে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত কাপড় আর বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে একজন জীবন্ত মানুষকে অবিকল শবের মতো সাজানো হয়। তারপর বাঁশের মাচায় তাঁকে শুইয়ে কাঁধে তুলে নেন উৎসাহী যুবকরা। শুরু হয় গ্রাম পরিক্রমা। উত্তর রায়পুরের বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, এই প্রথা কয়েক দশকের নয়, বরং এই রীতি চলে আসছে প্রায় দেড়শো থেকে দুশো বছর ধরে।
কেন এই প্রথা? তার সঠিক ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কারও জানা নেই। তবে লোকমুখে ফেরে এক অলৌকিক বিশ্বাসের কথা। গ্রামের বাসিন্দা ছোট্টু নন্দী বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা কেন এই নিয়ম শুরু করেছিলেন তার সঠিক হদিশ মেলে না। তবে আমরা বিশ্বাস করি, এই ধুলুরী উৎসবের মাধ্যমেই আমাদের গ্রাম সব আপদ-বিপদ থেকে মুক্ত থাকে। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, একসময় কলেরা বা বসন্তের মতো মহামারীর হাত থেকে গ্রামকে রক্ষা করতেই মা কালী ও মা মনসার আশীর্বাদ নিয়ে এই প্রথার সূচনা হয়েছিল।
জনশ্রুতি আছে, কোনো এক বছর এই অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় গ্রামে মড়ক দেখা দিয়েছিল। অনেক ক্ষতি হয়েছিল। তারপর থেকে কোনো বছরই এটা বন্ধ হয়নি। গ্রামের বৃদ্ধা আশালতা চক্রবর্তী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, মহামারীর সেই পুরানো আতঙ্ক আজ আর নেই। কিন্তু পূর্বপুরুষদের সেই নির্দেশ অমান্য করার সাহস দেখান না কেউ। গৃহবধূ রীনা বাগদির কথায়, দোল তো অনেক জায়গায় হয়, কিন্তু আমাদের রায়পুরের মতো জীবন্ত মানুষকে মৃতদেহ সাজিয়ে আনন্দ করার রীতি আর কোথাও নেই। আমাদের বিশ্বাস, মা মনসা ও মা কালীর কৃপায় এই গ্রাম আজও সুরক্ষিত।
আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এই প্রথাকে কেউ কুসংস্কার বলে দাগিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু উত্তর রায়পুরের মানুষের কাছে এটি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেখানে মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং শোককে তুড়ি মেরে উড়িয়ে রঙের বন্যায় মেতে ওঠার নামই জীবন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অনন্য লোক-ঐতিহ্যকে আজও সগৌরবে আগলে রেখেছেন সিউড়ির এই প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ। নিজস্ব চিত্র