


রাজদীপ গোস্বামী, গড়বেতা: লক্ষ্মীবারে ব্যস্ত গড়বেতা বাজার। বাঁদিকে কোর্ট রোড। দু’শো মিটার গেলেই যে দোতালা বাড়িতে ধাক্কা লাগে, সেটা নিরবচ্ছিন্ন ৩৪ বছরের বামশাসনের এক ল্যান্ডমার্ক! একদা লালদূর্গ গড়বেতার সিপিএম পার্টি অফিস।
পালা বদলের পর দুর্গের পতন ঘটলেও টিকে রয়েছে বাড়িটি। ২০১১-২০২৬। এর মধ্যবর্তী সময়ে সেটি কার্যত খাঁ খাঁ করত। দেওয়ালে ফিকে হয়েছিল লাল। পরে নতুন করে রং করা হয়। বাড়ির একটি ঘরে নিয়ম করে বসেন সিপিএমের ‘সম্পদ’ তপন ঘোষ। তাঁর সঙ্গী সুকুর আলিও আসেন প্রায়শই। গোটা বাংলা তখন দু’জনকে চিনত একটাই নামে—তপন-সুকুর। এখনও গড়বেতার হাওয়ায় ভাসে, এই জুটির কথা ছাড়া গাছের পাতা নড়ত না একসময়।
সেই তপন ঘোষের কাঁধে এবার লালদুর্গ পুনরুদ্ধারের ভার। এখন তাঁর সেই ‘ডাকাবুকো’ তকমা নেই। সেই দাপটও নেই। তবে, পার্টি অন্তপ্রাণ বৃদ্ধ তপনবাবুর স্বপ্ন একটাই—ফের লালগড় হোক গড়বেতা। কিন্তু, সেই স্বপ্নপূরণ যে বেশ কঠিন, তা বুড়ো হাড়ে টের পাচ্ছেন তপনবাবু। আসলে ‘সম্পদ’-এর সম্পদ যাঁরা, সেই পার্টিকর্মীদের একটা বড় অংশ পদ্মে ভিড়েছেন। তাঁদের ঘরে ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্চ তপনবাবুর।
কাজটা বড্ড কঠিন। তবে, চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখছেন না এই সিপিএম নেতা। গড়বেতাকে তিনি হাতের তালুর মতো চেনেন। পুরনো অনেক সঙ্গীকে পাশে পেয়েছেন। তাঁদের নিয়েই শুরু করেছেন লড়াই। বাম পরিবারের নতুন প্রজন্মের মন পেতেও ঝাঁপিয়েছেন তিনি। যাঁরা একসময় ভুল বুঝে রামে গিয়েছিলেন, তাঁদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। তাতে কাজ হচ্ছে। অনেকেই ফিরছেন। কেউ কেউ ফেরার আশ্বাস দিচ্ছেন। প্রচারে সাড়া মিলছে। প্রাণও ফিরছে পার্টি অফিসের। আনাগোনা বাড়ছে কর্মীদের। দুর্গ মেরামতে ভরসা পাচ্ছেন তপনবাবু। কিন্তু, পারবেন কি সমীকরণ বদলাতে?
এদিন পার্টি অফিসে বসে তিনি বলছিলেন, ‘অতীতে বিভিন্ন ঘটনায় আমাদের নেতাদের জড়ালেও মানুষ সত্য ঘটনা জানে। আর বিজেপি তো এখনও প্রার্থীই দিতে পারেনি। আমাদের পুরনো কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাচ্ছি। ভালোই সাড়া পাচ্ছি। গড়বেতার মানুষ আমাদের পাশেই থাকবেন।’
ঘটনা হল, ২০১১ সালে পরিবর্তনের হওয়া বইলেও গড়বেতার মানুষ সিপিএমের পাশেই ছিলেন। সেবার প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন তপনবাবুরা। ২০১৬ সালে গড়বেতা বিধানসভা যায় তৃণমূলের দখলে। সিপিএমের ভোট কমে হয়েছিল ২৬.২৭ শতাংশ। বিজেপি পেয়েছিল ১১ শতাংশ ভোট। একুশের নির্বাচনেও জয়ী হয় তৃণমূল। ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়স্থানে উঠে আসে বিজেপি। সিপিএমের ভোট ২৬.২৭ শতাংশ থেকে কমে ১১.৫ শতাংশে নেমে আসে। তার মানে এটা স্পষ্ট, বামেদের ভোট রামে যাওয়ার কারণে পতন ঘটেছিল বামদুর্গের। তপনবাবুরা মনে করছেন, পুরনো ঘর ঠিকঠাক গোছাতে পারলেই বাজিমাত। আর এই ঘর গোছানোর কাজে অনুঘটক গড়বেতায় বিজেপির গোষ্ঠীকোন্দল। যার জেরে এখনও প্রার্থীই ঘোষণা করতে পারেনি গেরুয়া শিবির।
গড়বেতায় রাস্তার ধারে ছোট্ট চায়ের দোকান। সেখানে চা পান করতে করতে শম্ভু দাস, রতন মণ্ডলরা বলছিলেন, ‘প্রচার-যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত সেয়ানে সেয়ানে লড়ছে তৃণমূল-বাম।’ তৃণমূল প্রার্থী উত্তরা সিংহ হাজরা বলেন, ‘বিজেপিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সিপিএমের অত্যাচার মানুষ ভোলেনি। জয় আমাদের নিশ্চিত।’ বিজেপি নেতা শঙ্কর গুছাইত বলেন, ‘সিপিএম আবারও শূন্য পাবে।’