


‘ওয়েস্টার্কটিকা’! শুনেছেন কখনও এমন দেশের নাম? আজব এই দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে এমন অনেক ‘স্বঘোষিত’ দেশ। কোথাও পেঁয়াজ খেতে মানা, তো কোথাও নেই মাটির কোনও গন্ধ। উদ্ভট সেই দেশগুলির গল্প লিখলেন মৃণালকান্তি দাস
১৯৫৪ সালের গ্রীষ্মের দুপুর। টোকিওর হানেদা বিমানবন্দর প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ত। ইউরোপ থেকে আসা একটি বিমান থামল রানওয়ের ধারে। একে একে নামতে লাগল যাত্রীরা। সেই ভিড়েই ছিলেন এক বিদেশি— স্মার্ট স্যুট, ধূসর চোখ, চিবুকে হালকা দাঁড়ি। সবার মতো তিনিও এগলেন ইমিগ্রেশন চেকের দিকে।
কিন্তু সবকিছু বদলে গেল যখন কাস্টমস অফিসারের চোখ পড়ল তাঁর পাসপোর্টে। সেখানে লেখা দেশের নাম... টরেড!
চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন অফিসার, এটা কোন দেশ?
যাত্রীটি আস্তে আস্তে উত্তর দিলেন, হাজার বছর ধরে ইউরোপেই আছে আমার দেশ। কাস্টমস অফিসার হাল্কা হেসে বললেন, দুঃখিত, এমন কোনও দেশের নাম আমরা জানি না।
ওই বিদেশিকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা রুমে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু তাঁর পাসপোর্ট, ভিসা, অন্যান্য কাগজপত্র... কোথাও কোনও ত্রুটি নেই। কিন্তু টরেড? কোথাও নেই এমন কোনও দেশ। মানচিত্রে নেই, ইতিহাসেও নেই। তাঁকে ডাকা হল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।
—আপনি কীভাবে এসেছেন এই দেশে? কেন এসেছেন?
শান্ত স্বরে যাত্রীটি বললেন, ‘আমি ব্যবসায়ী। জাপানে আমাদের একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স রয়েছে। আগেও এসেছি, তিনবার।’
তাঁকে বলা হল, মানচিত্রে নিজের দেশের অবস্থান দেখাতে। এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি আঙুল রাখলেন, স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যে এক ক্ষুদ্র স্থানে।
কাস্টমস অফিসার হেসে বললেন, এটি তো অ্যান্ডোরা! ভিনদেশি ব্যক্তি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন, যেন পৃথিবীর এই ম্যাপে কিছু একটা ভয়ঙ্কর ভুল রয়েছে। বললেন, না! এটা টরেড! হাজার বছর ধরে এখানেই আছে আমার দেশ! আপনারা ভুল করছেন! তাঁর চোখে-মুখে আতঙ্ক। যেন তাঁর পরিচয় কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জাপানি কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, লোকটিকে রাতে বিমানবন্দরের কাছেই একটি হোটেলে রাখা হবে। ঘরটি ছিল হোটেলের উপরতলার এককোণে— কোনও ব্যালকনি নেই। একমাত্র দরজাটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। জানালায় লোহার গ্রিল। ঘরের বাইরে মোতায়েন দু’জন রক্ষীও।
পরদিন সকাল। কাস্টমস অফিসাররা এলেন তাঁকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে। কিন্তু দেখা গেল ঘর ফাঁকা। বিছানা পরিপাটি, জানালা বন্ধ, দরজার তালা অক্ষত। অথচ লোকটা উধাও। তারপর অনেক তদন্ত, অনেক রিপোর্ট। কিন্তু সেই টরেডের বাসিন্দার কোনও হদিশ মিলল না।
পরবর্তীতে বহু তত্ত্ব উঠে আসে। কেউ বলেন, তিনি টাইম ট্রাভেলার—ভবিষ্যতের বাসিন্দা। আবার কারও মতে, তিনি ভিনগ্রহী! আর সবচেয়ে বাস্তববাদীরা বলেন— সবটাই নিছক গুজব।
আজও হানেদা বিমানবন্দরের পুরনো ফাইল ঘাঁটলে, সেই অজানা দেশের ‘টরেড’ ছাপমারা পাসপোর্টটির কপি এই গল্প বলে। সেই পাসপোর্ট এখন আর নেই। ঠিক যেমন নেই—সেই মানুষটিও। টিকে আছে শুধু একটা দেশের নাম—টরেড, এক মাইক্রোনেশন!
সম্প্রতি একটি ‘মাইক্রোনেশন’-এর ভুয়ো দূতাবাস ঘিরে গোটা ভারত তোলপাড়। নাম—‘ওয়েস্টার্কটিকা’ ২০০১ সালে এই ‘মাইক্রোনেশন’টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন কর্তা ট্র্যাভিস ম্যাকহেনরি। নিজেকে তার ‘গ্র্যান্ড ডিউক’ হিসেবে দাবি করেন। ম্যাকহেনরি নিজেকে শাসক নিযুক্ত করার জন্য অ্যান্টার্কটিক চুক্তি ব্যবস্থার মধ্যে একটি ফাঁক খুঁজে নিয়েছিলেন। অ্যান্টার্কটিক চুক্তি অনুযায়ী, কোনও দেশ অ্যান্টার্কটিকার কিছু অংশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। কিন্তু কোনও ব্যক্তি অ্যান্টার্কটিকার ওই সব অংশে কর্তৃত্ব ফলাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ওই চুক্তিতে কিছু উল্লেখ ছিল না। আর সেই সুযোগই নিয়েছিলেন ম্যাকহেনরি। অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত ওয়েস্টার্কটিকার আয়তন ৬ লক্ষ ২০ হাজার বর্গমাইল। ওয়েস্টার্কটিকা দাবি করে, তাদের নাগরিক সংখ্যা ২ হাজার ৩৫৬ জন। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁরা কেউই ওয়েস্টার্কটিকায় থাকেন না। ওয়েস্টার্কটিকার নিজস্ব পতাকা এবং মুদ্রাও রয়েছে। যদিও কোনও প্রতিষ্ঠিত দেশ ওয়েস্টার্কটিকাকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে তার মতোই অন্য ক্ষুদ্র দেশগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে ওয়েস্টার্কটিকা। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ওয়েস্টার্কটিকা একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবেও কাজ করে। আগে সেটির নাম ছিল ‘গ্র্যান্ড ডাচি অফ ওয়েস্টার্কটিকা’। সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তন এবং অ্যান্টার্কটিকা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে।
পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশের নাম ক’জন জানেন! এ কেমন দেশ? কোনও গাছ নেই, পশুপাখি নেই। থাকবেই বা কী করে? এই দেশটায় তো কোনও মাটিই নেই। চারদিকে উথাল-পাথাল সমুদ্র। তার মধ্যে দুটো বড়ো বড়ো গোল থামের উপর একটা পাটাতন। তার উপর একটা ঘর। পুরোটাই স্টিল দিয়ে তৈরি। এটাই নাকি একটা দেশ। ইংল্যান্ডের সাফোক উপকূল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে— সিল্যান্ড।
কেমন সেই দেশ? থামের গায়ে একটা দরজা। দুটো থামের প্রত্যেকটার ভিতরে সাতটা করে তলা আছে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেই দেখবেন, সুন্দর করে সাজানো তলাগুলির কোনওটা ডাইনিং হল, কোনওটা রান্নাঘর, কোনওটা শোওয়ার ঘর। পাটাতনের উপর রয়েছে একটা সুসজ্জিত ঘর। সেখানে অবশ্য কারও প্রবেশ নিষেধ। কারণ ওটাই এদেশের রাজপ্রাসাদ। দেশের তিনজন নাগরিকের একজন হলেন রাজা, একজন রানি, আরেকজন রাজপুত্র। রাজপ্রাসাদের মাথায় উড়ছে সেদেশের পতাকা। ক্ষুদ্রতম এই দেশটির মোট আয়তন ৫৫০ স্কোয়ার মিটার। একটা টেনিস মাঠের থেকে সামান্য বড়। এখানকার ভাষা ইংরেজি। মুদ্রা—সিল্যান্ড ডলার। তবে বাইরের কোনও দেশে এই মুদ্রা চলে না।
সিল্যান্ড আসলে একটা সমুদ্র দুর্গ। পোশাকি নাম—এইচ এম ফোর্ট রুঘশ। এটা তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। জার্মান সেনাদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সেনারা ব্রিটেনের উপকূল থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে এই দুর্গটি তৈরি করে। সেসময় এখানে ১৫০ থেকে ৩০০ সেনা থাকার ব্যবস্থা ছিল। থামের ভিতরে বিভিন্ন তলায় মজুত করা হতো অস্ত্রশস্ত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে অন্যান্য অসংখ্য দুর্গের সঙ্গে ব্রিটিশ সেনা এটাকেও পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। ১৯৬৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ নাগরিক মেজর প্যাডি রয় বেটস এবং তাঁর পরিবার এই দ্বীপের স্বত্বাধিকারী হন। তারপর তাঁরা একে একটি স্বাধীন ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। পৃথিবীর কোনও দেশ এখনও সিল্যান্ডকে স্বীকৃতি না দিলেও কেউ বিরোধিতাও করেনি। ২০১২ সালে রয় বেটস এবং ২০১৬ সালে তাঁর স্ত্রী জোয়ান মারা যান। বর্তমান রাজা মাইকেল, গত ৫০ বছর ধরে সিল্যান্ড নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন ‘হোল্ডিং দ্য ফোর্ট’ নামে বইয়ে।
অতীতে এমনই এক মাইক্রোনেশনের জন্ম দিয়েছিলেন রেডিও ব্রডকাস্টার র্যান্ডি উইলিয়ামস। নিজে একসময় রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্বীকৃত ১৯৩টি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। পরে সিদ্ধান্ত নেন, আর নয়, এবার নিজেই এবার নতুন একটি দেশ তৈরি করবেন! ক্যালিফোর্নিয়ার মরুভূমিতে ১১.০৭ একরের খালি জমি কিনে নেন। এই জায়গাটি হয়ে ওঠে উইলিয়ামসের দেশ—‘স্লোজামাস্তান’। যা আসলে তাঁর রেডিও শো’র নাম। নিজেকে দেশের স্বঘোষিত রাজা হিসেবেও ঘোষণা করেন তিনি। চোখে সানগ্লাস, গায়ে স্যুট পরে ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর উইলিয়ামস আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে ‘দ্য রিপাবলিক অব স্লোজামাস্তান’-এর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। খোলা আকাশের নীচে তাঁর সরকারি অফিস থেকে তা লাইভে সম্প্রচারও করেন। একইসঙ্গে দেশের রাজধানীর নাম দেন ডাবলানডিয়া। এই দেশের নিজস্ব পাসপোর্ট, পতাকা, মুদ্রা (ডাবল) ও জাতীয় সঙ্গীত রয়েছে। দাবি, স্লোজামাস্তানের মোট ৫০০ জন রেজিস্টার্ড নাগরিক রয়েছে। আরও সাড়ে ৪ হাজার জন নাগরিক হতে চান।
মাইক্রোনেশন গড়ার পাগলামি কীভাবে এল র্যান্ডি উইলিয়ামসের মাথায়? ২০২১ সালের আগস্টে উইলিয়ামস নেভাডায় অবস্থিত মাত্র ১১.৩ একরের একটি মাইক্রোনেশন ‘দ্য রিপাবলিক অব মলোসশিয়া’ ভ্রমণ করেন। ১৯৯৮ সালে আমেরিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওই ভূখণ্ডটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু পৃথিবীর মানচিত্রে আলাদা দেশ হিসেবে তার অস্তিত্ব আজও পাওয়া যায় না। অথচ, উইলিয়ামসকে সীমান্তে পাসপোর্টে সিল দেওয়া, ছবি তোলা ইত্যাদি সব প্রক্রিয়াই সম্পন্ন করতে হয়েছিল। দেশটির প্রেসিডেন্ট ‘মহামান্য’ কেভিন বাগের সঙ্গে মলোসশিয়া ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর। তবে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য। সব পর্যটকদের জন্যই একই নিয়ম।
কেমন দেশ ‘দ্য রিপাবলিক অব মলোসশিয়া’? সালটা ১৯৭৭। রিপাবলিক অব মলোসেশিয়ার যাত্রা শুরু সেবছরই। কেভিন বাগ নামে এক ব্যক্তি তাঁর বন্ধুর সঙ্গে মিলে নিজের বাড়িকে একটি স্বাধীন দেশ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেন। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও হয়ও তাই। একটি সাধারণ আমেরিকান বাড়িকে একটি স্বঘোষিত দেশে পরিণত করেন তাঁরা। এখন ওই দেশের নাগরিক মাত্র ৩৮ জন। নাগরিকদের তালিকায় তিনটি কুকুরও রয়েছে। মলোসশিয়ার সবকিছুই কেভিনের নিয়মেই চলে। তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি, এবং প্রতিটি বাসিন্দা তাঁর পরিবারেরই অংশ। রাস্তা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে পর্যটকদের সব বোঝানো—সবটাই করেন পরিবারের সদস্যরা। দেশের সমস্ত বিষয় পরিচালনা করেন কেভিন। সেখানে রয়েছে একটি দোকান, লাইব্রেরি একটি ছোট কবরস্থানও। প্রেসিডেন্ট কেভিন নিজেই দেশের জাতীয় সঙ্গীত ও আইন লিখেছিলেন। পতাকার নকশা বানান তিনি। ওই দেশে নিষিদ্ধ পেঁয়াজ ও ক্যাটফিশ। নাগরিকত্ব কেবল পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মলোসশিয়ার জাতীয় ভাষা ইংরেজি। তবে এস্পেরান্তো এবং স্প্যানিশও এখানে কথা বলা হয়। মলোসশিয়ার মুদ্রার নাম ভ্যালোরা।
মলোসশিয়া ভ্রমণের পরই উইলিয়ামের মাথায় ঘুরতে থাকে মাইক্রোনেশন গড়ার পাগলামি! উইলিয়ামসের স্বঘোষিত দেশের নাগরিক বা মন্ত্রী হওয়ার জন্য ওয়েবসাইটে আবেদন করা যায়। এই প্রবণতা ইদানিং বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রায় কয়েক হাজার মানুষ ওয়েবসাইটে আবেদনও করেছে। পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য বর্তমানে উইলিয়ামস স্লোজামাস্তানের সীমান্ত খুলে দিয়েছেন। সংবাদসংস্থা সিএনএনকে উইলিয়ামস বলেন, ‘স্লোজামাস্তানে একটি ওয়াটার রাইড, একটি আরমাডিলোর খামার ও মহান নেতা হিসেবে নিজের একটি ভাস্কর্য স্থাপন নির্মাণের জন্য ফান্ড সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’ অন্য দেশগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্যও তিনি চেষ্টা করছেন। এমনকী সম্প্রতি স্লোজামাস্তানের পাসপোর্ট দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড সহ ১৬টি দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। স্লোজামাস্তানের হয়ে যে কোনও পাবলিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় উইলিয়াম উজ্জ্বল সবুজ রঙের সুলতানি পোশাক পরেন। নিজের চারপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রক্ষীও ভাড়া করেছেন। অদ্ভুত সব আইনও জারি করেছেন তিনি। শুনলে অবাক হবেন, স্লোজামাস্তানে স্যান্ডেল পরা বেআইনি। আইন ভাঙলে জেল!
পোলিশ পর্যটক কামিল ভরোনা ও তাঁর বন্ধুরা স্লোভেনিয়ায় বেড়াতে যাওয়ার পরই এই গল্পের শুরু। ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেবের ৫০ কিলোমিটার দূরের এক ছিমছাম গ্রাম মেটলিকি। সেখানকার বাসিন্দারা কামিলদের দলটিকে জানান, দানিয়ুব নদীর পাড় ঘেঁষে ছোট্ট এক টুকরো জমি এখনও খালি পড়ে আছে। অর্থাৎ কয়েক দফায় সীমান্ত নিয়ে তুলকালামের পরও স্লোভেনিয়া বা ক্রোয়েশিয়া কোনও দেশই ওই জমির মালিকানা দাবি করেনি। পর্যটকদের দলটি ভাবতে শুরু করে, এখানেই নতুন দেশ প্রতিষ্ঠা করবেন তারা। ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল কামিল ভরোনা আর তাঁর দলবল দুনিয়ার কনিষ্ঠতম এই ‘মাইক্রোনেশন’ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। দেশের নাম রাখা হয় ‘এনক্লেভা’। বাংলায় যার অর্থ ‘ছিটমহলা’। তবে, কাগুজে নাম ‘কিংডম অব এনক্লেভা’। রাজধানীর নামও তাই। দেশটির মূল মন্ত্র—সিটিজেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড বা বিশ্ব নাগরিক। দেশটিতে যেতে পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না। আর দুনিয়ার যে কোনও জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষার যে কেউই ওই দেশের নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন।
কিন্তু সেই বছরই ২১ মে ক্রোয়েশিয়ার বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানায়, ‘ওই এলাকাটি তাদের দেশের মধ্যে পড়েছে এবং এর মালিকানা স্পষ্ট করতে প্রয়োজনে সালিশি আদালতে যাবে তারা।’ এর দু’দিন পর সংবাদ সংস্থা এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে ছিটমহলার বাসিন্দারা জানায়, ‘ছিটমহলাবাসীরা যেহেতু অন্য দেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তাই ওই এলাকা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।’ নতুন এই দেশের বাসিন্দারা একটু সরে গিয়ে আস্তানা গাড়ে দানিয়ুব নদীর পাড়ের আরেকটি দাবিহীন ভূখণ্ডে। এমন আরেকটি মাইক্রোনেশন ফ্রি রিপাবলিক অব লিবারল্যান্ডের কাছে। নতুন এই ভূখণ্ডের আয়তন মাত্র ১ হাজার বর্গ মিটার। ছিটমহলার বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই সরকার গঠন করেছে। বর্তমান রাজা এনক্লেভ দ্য ফার্স্ট। প্রধানমন্ত্রী লেডি অ্যানেমারিজিন তামিঙ্গা। রাষ্ট্রীয় ভাষা ইংরেজি, পোলিশ, স্লোভেনীয়, ক্রোয়েশীয় ও চীনা।
ধর্ষণ এবং অপহরণের অভিযোগে অভিযুক্ত, বিতর্কিত স্বঘোষিত আধ্যাত্মিক গুরু নিত্যানন্দ ২০১৯ সালে ভারত থেকে পালিয়ে যান। অনেক দিন খবর ছিল না তাঁর। এর এক বছর পরে হঠাৎই আবার উদয় হয়ে দাবি করেন, একটি আলাদা দেশ তৈরি করেছেন তিনি। যে দেশে সকলেই নাকি হিন্দু ধর্মাবলম্বী। নাম ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব কৈলাস’ (ইউএসকে)। সেই দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করতে রাষ্ট্রসঙ্ঘে প্রতিনিধি দল পাঠান ফেরার এই আধ্যাত্মিক গুরু। যদিও এই দেশটি কোথায়, কেউ জানে না। কৈলাসের প্রতিনিধিরাও নিয়মিত সারা বিশ্বের কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনার ছবি এবং ভিডিও পোস্ট করেন। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইকুয়েডরের উপকূলে একটি দ্বীপ কিনেছিলেন নিত্যানন্দ। সেখানেই নাকি আস্ত একটি দেশ গড়ে ফেলেছেন এই স্বঘোষিত গুরু। এখনও পর্যন্ত কৈলাসের কোনও ছবি প্রকাশ্যে আসেনি। ইকুয়েডর সরকারের দাবি, নিত্যানন্দের দেশের কোনও অস্তিত্ব নেই। মনে করা হয়, নিত্যানন্দের আঁটসাঁট নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণেই এখনও পর্যন্ত কেউ সেই দেশের ছবি তুলে আনতে পারেননি।
আমেরিকার ওরেগনে ‘রজনীশপুরম’ নামে মাইক্রোনেশন শুরু করেন ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরু রজনীশ। যার ভিতরে ছিল, এয়ারপোর্ট, হোটেল, রেস্তরাঁ, টেনিস কোর্ট, সিনেমা হল। আশ্রমে ছিল ৯৯টি ‘রোলস রয়েস’, গোটা দশেক হেলিকপ্টার ও প্রাইভেট জেট। আচার্য্য রজনীশ ওরফে ‘ওশো’ প্রতিদিন দেড় ঘণ্টা ধরে অনুচ্চ স্বরে ব্যাখ্যা করতেন তাঁর ধর্মদর্শন। যেটিকে সমালোচকেরা ‘তান্ত্রিক যৌনতা’ আখ্যা দিয়ে থাকেন। দেশ-বিদেশের সাংবাদিকেরা একবার রজনীশকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁর আশ্রমে যৌনতার ছড়াছড়ি কেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘যৌনতা আনন্দ ও উপভোগের জিনিস। তাই পিল আবিষ্কার হওয়ার পর এটা উপভোগ করতে বাধা কোথায়!’ তাঁর ভক্তরা সবাই ধনী। এই প্রসঙ্গে রজনীশের উত্তর, ‘সব মহাপুরুষ তো গরিবদের উদ্ধারের জন্য এসেছেন, আমি না হয় ধনীদের উদ্ধারের জন্যই রইলাম।’ যদিও একসময় মার্কিন মুলুক থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিলেন স্বঘোষিত ভগবান চন্দ্রমোহন জৈন ওরফে রজনীশকে। সেই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায় ‘রজনীশপুরম’।