সন্দীপন দত্ত, কোচবিহার: রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছে বহু আগে। বদলেছে রাজনীতির প্রেক্ষাপট। বদলায়নি কোচবিহার রাজপরিবারের প্রায় পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন নিয়ম ও ঐতিহ্য। নরবলির প্রথা উঠে গেলেও আজও নররক্ত ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায় কোচবিহারের বড়োদেবীর পুজো। মহাঅষ্টমীর শেষ রাতে গুপ্ত পুজোর সময় দেবীর চরণে নিবেদিত হয় নররক্ত।
৫০০ বছরেরও বেশি আগে কোচবিহার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা বিশ্বসিংহের রাজত্বকালে বড়োদেবীর পুজোর সূচনা হয়। সূচনাপর্বে পুজোর অঙ্গ হিসাবে নরবলির প্রথা চালু ছিল বলে কথিত আছে। পরবর্তীতে নরবলির বদলে সূচনা হয় নররক্ত উৎসর্গ করার প্রথা। যা আজও পালিত হয়ে আসছে।
কোচবিহারের রাজপুরোহিত হীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন, বড়োদেবীর পুজোয় নরবলির প্রথা ছিল। পরবর্তীতে নিয়ম বদলে নররক্ত প্রদানের রীতি চালু হয়। মহাষ্টমীর গভীর রাতে দেবীবাড়ির মূল মন্দিরের পিছনে এক গোপন কক্ষে আসেন সিদ্ধেশ্বরীর নির্দিষ্ট একটি পরিবারের বংশধর। বংশানুক্রমিক ভাবে তাঁরাই গুপ্তপুজো সুসম্পন্ন করেন।
বড়োদেবীর গুপ্তপুজোর সময় ওই কক্ষে কেবল পরিবারের একজন সদস্যই উপস্থিত থাকতে পারেন। বেল বা লেবুর কাঁটা দিয়ে ডান হাতের আঙুল থেকে রক্ত উৎসর্গ করা হয়। সেই রক্ত দিয়ে আঁকা হয় বিশেষ আলপনা। প্রক্রিয়া চলাকালীন বাইরে অপেক্ষা করেন পুরোহিত। আলপনা আঁকা সম্পন্ন হলে পুরোহিত কক্ষে প্রবেশ করে গুপ্তপুজো শুরু করেন। দেবীকে সেই রক্ত উৎসর্গ করেন।
অতিগোপনীয় এই পুজো চলাকালীন দেবীবাড়ির সামনের অংশ সম্পূর্ণ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। রক্ত নিবেদনের পর পাঁঠা ও পায়রা বলির মাধ্যমে ভোররাতে শেষ হয় বড়োদেবীর গুপ্তপুজো।
কথিত আছে, স্বপ্নাদেশে বড়োদেবী রক্তবর্ণা প্রতিমা গড়ার নির্দেশ দেন। দেবীর সঙ্গে থাকেন জয়া ও বিজয়া। আর বাহন হিসাবে অবস্থান করেন বাঘ ও সিংহ। বড়োদেবীর বিশাল প্রতিমার চোখে অশুভশক্তিকে বিনাশ করার এক অলৌকিক তেজ ফুটে ওঠে। কোচবিহার, উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে বড়োদেবীর এই পুজোর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।



