নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: জাল ডিসিআর কাণ্ডে কোটি কোটি টাকা লুটের মামলায় রাঘববোয়ালরা এখনও অধরা। উলটে হাই-প্রোফাইল টুলু মণ্ডল সিন্ডিকেট কাণ্ডে প্রথম অভিযুক্ত হিসেবে শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়ে গিয়েছেন তাঁর অন্যতম ম্যানেজার নইমুদ্দিন মণ্ডল। আর এতেই কার্যত মুখ পুড়েছে বীরভূম জেলা পুলিশের। প্রভাবশালীদের সুকৌশলে আড়াল করার যে অভিযোগ শুরু থেকে উঠছিল, নইমুদ্দিনের জামিনে তা আরও জোরালো হয়েছে। এবার সমালোচনার মুখ থেকে বাঁচতেই মরিয়া ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামল প্রশাসন। সোমবার আচমকাই পুরনো দুই অভিযুক্ত টুলুর আত্মীয় মীনার মণ্ডল এবং ভূমিদপ্তরের কর্তা প্রবীর কুমার দাসকে নতুন করে নিজেদের হেফাজতে নিল পুলিশ।
গত জুলাই মাসের শেষে মহম্মদবাজারে এই মীনারের বাড়ি থেকেই উদ্ধার হয়েছিল নগদ সাড়ে ২৮ কোটি টাকা এবং ১৫ কেজি সোনা। এরপরই প্রকাশ্যে আসে জেলার পাথর শিল্পাঞ্চলে চলা জাল ডিসিআর চক্র। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে মীনার, প্রবীর, সীতেশ, নইমুদ্দিন-সহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। প্রথম দিকে পুলিশ হেফাজতে থাকলেও, গত প্রায় একমাস ধরে মীনার এবং প্রবীর জেল হেফাজতে ছিলেন। এতদিন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের তেমন কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি পুলিশ। কিন্তু শুক্রবার নইমুদ্দিন জামিন পেতেই শনিবার রাতে তাঁর ক্রাশারে হানা দেয় পুলিশ। এরপর সোমবার তড়িঘড়ি মীনার ও প্রবীরকে পুনরায় হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয় সিউড়ি আদালতে।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, কোর্টে এদিন সরকারি আইনজীবী দাবি করেন, তদন্তে বেশ কিছু নতুন তথ্য উঠে এসেছে। সেগুলি যাচাই করা এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার স্বার্থে ওই দু'জনকে নতুন করে জেরা করা প্রয়োজন। তাই মীনারের সাতদিন এবং প্রবীরের পাঁচদিনের পুলিশ হেফাজত চাওয়া হয়। যদিও অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী সোমনাথ মুখোপাধ্যায় এবং রাফেউল হক পুলিশের এই পদক্ষেপকে ‘বিলম্বে দুষ্টু বুদ্ধির উদয়’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁরা এদিন বলেন, কয়েকদিন আগেই জেলা জজ এক আসামির জামিন মঞ্জুর করেছেন। আর তারপর থেকেই পুলিশের অন্দরে একটা ছটফটানি শুরু হয়েছে। প্রতিহিংসামূলক আচরণ থেকেই পুলিশ এমন পদক্ষেপ করছে। পুলিশের যুক্তিগুলিকে ‘অত্যন্ত হাস্যকর’ দাবি করে আইনজীবীদের পাল্টা যুক্তি, অন্য আসামিকে গ্রেপ্তার করার জন্য এত বড় পুলিশ ফোর্স থাকতে জেলের আসামিকে কেন লাগবে? আর যদি সত্যিই নতুন কোনও তথ্য উঠে এসে থাকে, তবে পুলিশ জেলে গিয়েই আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারতেন। দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারক ওই দুই অভিযুক্তের চারদিনের পুলিশ হেফাজত মঞ্জুর করেন।
তদন্তের শুরুতে পুলিশের দাবি ছিল, ধৃত ম্যানেজার সীতেশের ডায়েরি থেকে ভূমিদপ্তরের কর্তাদের রেটচার্ট এবং সিন্ডিকেটের টাকার গতিপথের হদিশ মিলেছে। তা সত্ত্বেও প্রায় ৫০ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রসাশনের প্রভাবশালী কর্তারা কেন ধরা পড়ল না, তা নিয়ে পুলিশের সদিচ্ছা প্রশ্নের মুখে। ওয়াকিবহাল মহলের একটাই প্রশ্ন, আগামী চারদিনের ম্যারাথন জেরায় পুলিশ কি সত্যিই আসল মাথাদের নাম প্রকাশ্যে আনবে? নাকি নতুন করে আরও কয়েক জন চুনোপুঁটিকে গ্রেপ্তার করে রাঘববোয়ালদের আড়ালের চিত্রনাট্যের ধারাকে অব্যাহত রাখা হবে?