সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: আলমারির এক কোণে রাখা মাটির পুতুলগুলো বের করে ধুলো ঝাড়ছে খুদে হাত। কেউ নতুন পুতুল কিনছে, কেউ আবার ভাবছে কোথায় থাকবে ছোট্ট ঘর, কোথায় বানানো হবে পাহাড়, কোথায় বসবে কৃষক, কোথায় থাকবে গোরু-ছাগল। ঝুলন সাজানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত এখন অনেক খুদে। এই দৃশ্য যেন কয়েক দশক পিছিয়ে দিচ্ছে প্রবীণদের। চোখের সামনে ভেসে উঠছে তাঁদের ছোটবেলা। বাড়ির উঠোনে কাঠ,মাটি, রং দিয়ে সাজানো ছোট্ট গ্রাম, সারি সারি মাটির পুতুল আর ঝুলন দেখতে আসা পাড়া-প্রতিবেশীদের ভিড়।
আগামী রবিবার ঝুলন। সময় বদলেছে, বদলেছে উৎসব পালনের ধরনও।একসময় ঝুলন মানেই ছিল পাড়ায় পাড়ায়, বাড়িতে বাড়িতে উৎসবের আবহ। ঘরের এক কোণে কাঠ, মাটি, কাপড় কিংবা নানা সামগ্রী দিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট ঝুলনের আসর। সেখানে সাজানো হতো মাটির পুতুল, ছোট ছোট ঘরবাড়ি, গাছপালা, পশুপাখি, কৃষিকাজের দৃশ্য থেকে শুরু করে নানা রকমের চরিত্র। ছোটদের কাছে সেই আয়োজন ছিল উৎসবের অন্যতম আনন্দ। সময়ের সঙ্গে সেই পুরনো চল অনেকটাই কমেছে। তবে হারিয়ে যায়নি। নতুন করে ছোটদের মধ্যে ঝুলন নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়ায় ফের চাহিদা বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় পুতুলের।
ঝুলন এলেই তাই শুধু পুতুলের বাজার জমে ওঠে না, প্রবীণদের মনেও জমে ওঠে স্মৃতির মেলা। তাঁদের কথায় কথায় ফিরে আসে সেই সময়ের গল্প। কীভাবে কয়েক দিন আগে থেকেই ঝুলনের প্রস্তুতি শুরু হত, কীভাবে বাড়ির সকলে মিলে পুতুল সাজাতেন, কোন বাড়ির ঝুলন সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে তা দেখতে কীভাবে ছুটে যেতেন এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে।আজকের শিশুদের হাতে সেই মাটির পুতুল দেখে প্রবীণদের অনেকেই বলছেন, সময় বদলেছে, কিন্তু ঝুলনের আনন্দটা যেন এখনও একই রয়ে গিয়েছে। ঝুলন নিয়ে বলতে বলতে সত্তরোর্ধ্ব গোবিন্দ মণ্ডলের চোখে মুখে আনন্দের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, আমাদের সময় ঝুলনের আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছু প্রয়োজন হতো না। মাটির তৈরি কয়েকটি পুতুল, কিছু রং, কাঠের টুকরো, কাগজ, কাপড় আর নিজেরাই পরিকল্পনা করে ঝুলন তৈরি করে ফেলতাম। তখন অনেকেই বাড়ি বাড়ি ঝুলন দেখতে যেত। প্রতিটি বাড়িতেই যেন উৎসবের আবহ তৈরি হয়ে যেত।
বর্তমানে সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। মোবাইল,টিভি, ইন্টারনেট এবং নানা ধরনের আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে বাড়িতে বাড়িতে ঝুলন সাজানোর সেই পুরনো রীতি আর দেখা যায়না বললেই চলে। তবে এবছর ছবিটা যেন কিছুটা অন্যরকম। ঝুলন করবে বলে অনেক শিশু থেকে যুবক ইতিমধ্যে বিভিন্ন ধরনের মাটির পুতুল কিনতে শুরু করেছে।
পুতুল কিনতে আসা ১৫ বছরের বালক মিলন দাস বলে, আমি এবছর প্রথম ঝুলন করব। দাদু, বাবাদের মুখে শুনেছি আগে বাড়িতে ঝুলন হতো। অনেকদিন হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে পুরানো কিছু পুতুল আছে। আর কিছু নতুন কিনতেও এসেছি। আমি ঝুলন করব শুনে দাদু খুব খুশি হয়েছে। হয়তো আগের মতো বাড়ি বাড়ি ঝুলন হয় না, তবু মাটির পুতুল ঘিরে শিশুদের উচ্ছ্বাসে বোঝা যায়, ঝুলনের টান এখনও ফুরোয়নি। স্মৃতির হাত
ধরেই যেন ফিরছে হারানো দিনের উৎসব। -নিজস্ব চিত্র