ভাদিয়া (গুজরাত): নারী সুরক্ষা দূর অস্ত। ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ অবাস্তব চিন্তাভাবনা। নারী-পুরুষের সমান অধিকার তো শুধুই গল্প! এখানে মেয়ে হয়ে জন্মানো মানেই অভিশাপ। বেঁচে থাকার শুধুমাত্র দু’টি বিকল্প— বাল্যবিবাহ, নাহলে দেহব্যবসা। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও ভাদিয়া গ্রামে দিব্যি চলছে এই মধ্যযুগীয় রীতি। সেজন্য গুজরাতের এই গ্রামটি ‘যৌনকর্মীদের গ্রাম’ হিসাবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই এখানকার মহিলাদের দেহ ব্যবসায় নামানো হয়। বাড়ির পুরুষরাই তাঁদের জন্য ‘খদ্দের’ ধরে আনেন।
বনসকাঁথা জেলার এই গ্রামের বর্তমান জনসংখ্যা ৭৫০। এর মধ্যে ৩৫০ জন মহিলা। সকাল হলেই পুরুষরা পালনপুর-থারাড হাইওয়েতে চলে যান। ট্রাকচালক, পথচারি ও আশপাশের গ্রামের পুরুষদের খোঁজ করেন। তাদের খদ্দের হিসাবে নিয়ে আসেন বাড়িতে। দেশে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ। ভাদিয়া গ্রামে অবশ্য এই নিয়ম চলে না। এখানে বাল্যবিবাহ মেয়েদের দেহব্যবসা থেকে পরিত্রাণের উপায়। বিয়ে করলে গ্রামের বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ মেলে।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রামের এক তরুণী জানান, তাঁর মা ও দিদা যৌনকর্মী। বিয়ে হয়ে যাওয়ায় কোনোক্রমে রক্ষা মিলেছে তাঁর। একটি কলেজে নার্সিংয়ের এই ছাত্রী জানিয়েছেন, ‘ছোটো থেকে দেখতাম, মা ও দিদার জন্য খদ্দের ধরে আনত বাবা-কাকা। মাকে অবশ্য কেউ বাধ্য করেনি। দারিদ্রের কারণেই ওই পেশায় এসেছিলেন তিনি। তবে আমাকে ও পথে ঠেলে দিতে চাননি। ১১ বছর বয়সে আমার বাগদান সম্পন্ন হয়। ১৮ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায়।’ চন্দ্রা সারানিয়া নামে এক মহিলা জানান, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁকে যৌনকর্মী হতে বাধ্য করা হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে চন্দ্রার পরিবারকে চাষের জন্য জমি দিয়েছিল সরকার। তবে গ্রামে সেচের ব্যবস্থা না থাকায় আর কোনো উপায় ছিল না। কোনোক্রমে উপার্জিত অর্থে দুই ছেলে ও এক মেয়েকে বড়ো করেছেন। মেয়ের ১৮ বছরে পা দিতেই বিয়ে দিয়েছেন।
গ্রামের মহিলাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন সংগঠন। ২০১২ সালে প্রথমবার ভাদিয়ায় গণবিবাহের আয়োজন করেছিল একটি এনজিও। ১৬০ পরিবারের মধ্যে ৯০টিকে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন আয়োজকরা। তারপর থেকে প্রতি বছর এখানে গণবিবাহের আসর বসে। বহু সমাজকর্মী বাল্যবিবাহের প্রতিবাদ করেছেন। তবে অনেকেই বলছেন, দেহব্যবসায় চেয়ে এটা অনেক বেশি ভালো।
লোককথা অনুযায়ী, গ্রামের সারানিয়া সম্প্রদায় একটি যাযাবর উপজাতি। একময় তারা মেবারের মহারানা প্রতাপের বাহিনীর অংশ ছিল। পুরুষরা ঢাল-তলোয়ারে শান দিতেন। মহিলারা সেনার মনোরঞ্জনে ব্যস্ত থাকতেন।