


সুব্রত ধর, হাতিঘিষা (নকশালবাড়ি): কৃষকের অধিকার থেকে ভোটাধিকার হরণ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি থেকে রান্নার গ্যাসের সংকট। এমনকী কর্মসংস্থানের দিশা নেই! তাই বিজেপি নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার’ বলে কটাক্ষ করছে নকশাল আন্দোলনের আঁতুরঘর নকশালবাড়ি। বিধানসভা ভোটের ময়দানে চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, জঙ্গল সদ্দারের সহযোদ্ধাদের প্রত্যাশা, শীঘ্রই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে হবে গণআন্দোলন। পদ্ম শিবির অবশ্য বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ। গেরুয়া শিবিরের নেতাদের বক্তব্য, দেশ এখন নকশালমুক্ত। কাজেই কে, কী বলছেন তাতে গুরুত্ব দিচ্ছি না। সার্বিক বিকাশের দাবিতেই লড়াই করছি। উভয়পক্ষের এমন বক্তব্যে ভোটের ময়দান সরগরম।
লাঙল যাঁর, জমি তাঁর। একদা এই স্লোগান তুলেই প্রায় ৫৯ বছর আগে নকশালবাড়িতে কৃষক আন্দোলন হয়। জমিদার ও জোতদারদের বিরুদ্ধে সেই সশস্ত্র সংগ্রামের পর দেশ তো বটেই, গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে জায়গা করে নেয় নকশালবাড়ি। সেই আন্দোলনের যে ক’জন বেঁচে আছেন, তাঁদের মধ্যে খেমু সিং ও তাঁর স্ত্রী লিলি কিষান অন্যতম। খেমুর বয়স ৭৬। খড়িবাড়ির রামভোলাজোতে বাড়ি। একদা খেমু নকশালদের উত্তরবঙ্গ জোনের গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। বন্দুক হাতে কোচবিহার থেকে বিহারের পূর্ণিয়া পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রীও পিস্তল চালাতেন। দু’জনই কয়েকবার জেল খেটেছেন। এই দম্পতি চারু মজুমদার, কানু সান্যালদের অন্যতম সহযোদ্ধা।
এই দম্পতির বক্তব্য, এসআইআরের নামে ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। কৃষকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। তাই বিজেপি নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় সরকার ফ্যাসিস্ট। ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে হাঙ্গামা পাকানোর চেষ্টা করছে।
নকশাল আন্দোলনের গেরিলা বাহিনীর আর এক সদস্য ছিলেন ধনবাহাদুর ছেত্রী। রামভোলাজোতে তাঁর বাড়ি। তাঁর বয়স ৭৮। তিনি বলেন, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বাবা, দাদাদের দেখে নকশাল আন্দোলনের গেরিলা বাহিনীতে শামিল হই। বহু লড়াই করেছি। জেলও খেটেছি। এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই অন্যরকম। দেশে এক নায়কতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা করছে বিজেপি। তারা পুঁজিপতিদের দালাল। পদে পদে আমজনতাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে হয়রান করছে।
চারু মজুমদার ও কানু সান্যালদের আর এক সহযোদ্ধা শান্তি মুর্মু। কানু সান্যালের গ্রাম হাতিঘিষার সেবদ্দোল্লাজোতে তাঁর বাড়ি। বয়স ৮৪ বছর। বৃদ্ধা শান্তির গলায় এখনও সংগ্রামের তেজ। লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির আঙিনায় হাঁটতে হাঁটতে বলেন, দেশের অবস্থা ভয়ঙ্কর। চাল, ডাল, সবজি, জ্বালানি সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হুহু করে বাড়ছে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। কাজের খোঁজে বাইরে যাচ্ছেন যুবক-যুবতীরা। কেন্দ্রীয় সরকার এসব সমস্যা মেটাতে ব্যর্থ।
১৯৬৭ সালের ২৪ মে নকশালবাড়িতে কৃষক আন্দোলনের সূচনা হয়। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে লড়াইয়ে এক পুলিশ অফিসারের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পরের দিন ২৫ মে পালটা পুলিশের সঙ্গে লড়াইয়ে ১১ জন গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়। নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুবক ওই নেতা-নেত্রীদের প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন হবেই।
পালটা মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিদায়ী বিধায়ক তথা বিজেপি প্রার্থী আনন্দময় বর্মন বলেন, দেশ এখন নকশালমুক্ত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সবকা সাথ, সবকা বিকাশ স্লোগান নিয়েই এগিয়ে চলছি। কাজেই কে কী বলছেন, তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। এখন নকশালবাড়ির বাসিন্দারা আমাদের সঙ্গে। • নিজস্ব চিত্র।