ভৈরবী ব্রাহ্মণী শ্রীরামকৃষ্ণকে চৌষট্টি তন্ত্রে উপদিষ্ট সর্বপ্রকার সাধন করাইয়াছিলেন। ব্রাহ্মণী তান্ত্রিক সাধনার জন্য বিল্ববৃক্ষ মূলে তিনটি মানুষের মাথার ও পঞ্চবটীমূলে পঞ্চমুণ্ডী আসন প্রস্তুত করিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও বিল্ববৃক্ষমূলে কখনও পঞ্চবটীতে গভীর নিশীথে কঠিন কঠিন তান্ত্রিক সাধনা করিতে লাগিলেন। এই সকল বীরাচারের সাধনে পঞ্চ ‘ম’কারের প্রয়োজন হইয়া থাকে। শ্রীরামকৃষ্ণের মদ্য বা কারণ গ্রহণের প্রয়োজন হইত না। কারণের নাম শুনিলেই তাঁহার জগৎকারণের উদ্দীপন হইয়া সমাধির অবস্থা আসিয়া উপস্থিত হইত এবং ‘যোনি’ নামে জগৎযোনির দর্শন আসিয়া উপস্থিত হইত। দেখিতেন, সেই জগৎযোনি হইতে পলকে কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড প্রসূত হইতেছে। সুতরাং পঞ্চ ‘ম’কারের সাধনের প্রধান দুই অঙ্গ তাঁহার ব্যবহার করিবার প্রয়োজন হইত না। বীরাচারের সাধন তাঁহার নিকট পঞ্চ ‘ম’কারহীন সাধনে পরিণত হইল। তন্ত্রোক্ত সাধনের সময়ে তাঁহার রূপ যেন শরীরে ধরিতেছিল না। যে দেখিত সে-ই আর চক্ষু ফিরাইতে পারিত না। এই সময়ে তিনি সারাদিন একখানি মোটা চাদরে শরীর ঢাকিয়া রাখিতেন। তাঁহার হস্তে বাঁধা সোনার ইষ্টকবচের বর্ণের সহিত শরীরের বর্ণ এক হইয়া গিয়াছিল।
এই সময়ে তাঁহার আবার সেই উন্মনাভাব আসিয়া উপস্থিত হইল। হস্তে ত্রিশূল লইয়া গঙ্গার কূলে গম্ভীরভাবে পাদচারণ করিবার কালে তাঁহার পরিধানের বসন স্খলিত হইয়া পড়িত, শুধু চাদরখানি গায়ে থাকিত, তাহাও কখন কখন খসিয়া পড়িয়া যাইত। তিনি যেন এ জগতের লোক নহেন। ব্রাহ্মণী তাঁহার গায়ের চাদর পড়িয়া গেলে জড়াইয়া দিতেন, কারণ তাঁহার রূপ এত দুর্নিরীক্ষ্য হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহা যেন প্রতি লোমকূপের ভিতর দিয়া শিখার ন্যায় বাহির হইয়া দর্শকের চক্ষু ঝলসাইয়া দিত। এই সময় তিনি চিতাধূম পান করিবার জন্য মত্ত হইয়া ছুটিতেন এবং যেস্থানে চিতাধূমের গন্ধ পাইতেন সেইস্থানেই যাইতেন।
এই কালে তাঁহার এক বিপরীত ক্ষুধার উদয় হইয়াছিল। ব্রাহ্মণী তাহাও দূর করিলেন। এক ঘরে বিবিধ খাদ্যদ্রব্য স্তরে স্তরে সজ্জিত করিয়া রাখিলেন, এবং সেই ঘরে শ্রীরামকৃষ্ণকে রাখিয়া যখনই ক্ষুধা পাইবে তখনই যাহা অভিরুচি হইবে তাহাই আহার করিতে নির্দেশ দিলেন। সেই ঘরে থাকিয়া এটা ওটা আহার করিতে করিতে তাঁহার সেই দুরন্ত বিপরীত ক্ষুধা দূর হইয়াছিল। ভৈরবী ব্রাহ্মণী রাত্রিতে এইভাবে তাঁহার সাধনার সমস্ত দ্রব্য আয়োজন করিতেন এবং দিনের বেলা যশোদার ভাবে গান গাহিতে পল্লীর অন্যান্য নারীগণসহ শ্রীরামকৃষ্ণকে আহার করাইবার জন্য বিবিধ মিষ্টান্ন লইয়া আসিতেন।
একদিন কালীমন্দিরের সম্মুখে শ্রীরামকৃষ্ণ, হৃদয় ও মথুরানাথ আলাপ করিতেছেন এমন সময় বহুদূর হইতে বামাকণ্ঠের সঙ্গীতধ্বনি তাঁহাদের শ্রবণগোচর হইল। ক্রমে সেই স্বর যেন নিকটে আসিতে লাগিল। মন্দির-প্রাঙ্গণে সেই গান স্পষ্ট শোনা যাইতেই শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধিস্থ হইলেন। এক নারী বারাণসী শাড়ী ও নানাবিধ অলঙ্কারে বিভূষিতা ও মাখন এবং মিষ্টান্নপূর্ণ একখানি থালি হস্তে লইয়া বহু মহিলা পরিবেষ্টিতা হইয়া উচ্চৈস্বরে গান গাহিতে গাহিতে ধীর পাদক্ষেপে আসিতেছেন।
স্বামী শঙ্করানন্দের ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-চরিত’ থেকে