বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: এতদিন প্রতি পুজোয় কমবেশি রক্তের জন্য হাহাকার পড়ে যেত। এবারে শুধু রক্ত নয়, হাহাকার পড়েছে ডোনারের জন্যও! আরও স্পষ্ট করে বোঝালে, অধিকাংশ ব্লাড সেন্টার (পূর্বতন ব্লাড ব্যাংক) রোগীর বাড়ির লোকজনের মুখের উপর বলে দিচ্ছে, হয় ডোনার নিয়ে আসুন, নয়ত রক্ত পাবেন না। মানে যদি কেউ এ পজিটিভ ১ ইউনিট রক্ত ব্লাড সেন্টার থেকে নেন, তাহলে রোগীর বাড়ির লোককে হয় এ পজিটিভ নয়ত অন্যকোনো গ্রুপের রক্ত দান করতে হবে। এমনকি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ঘনিষ্ঠ পরিজনের জন্য রক্ত জোগাড় করার জন্যও রিপ্লেসমেন্ট ডোনেশন দাবি করছে বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংক। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের গ্রুপে গ্রুপে ঘুরছে বিভিন্ন কাতর বার্তা। এমনই একটি বার্তা তুলে দেওয়া হল—‘আমার এক নিকট আত্মীয় থ্যালাসেমিয়া মেজর এবং প্রতি তিনসপ্তাহ পরপর ওকে রক্ত দিতে হয়। আমরা বর্তমানে খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। রিপ্লেসমেন্ট ডোনার না দিলে ব্লাড ব্যাংক রক্ত দিতে চাইছে না। ২৫ তারিখ ওকে রক্ত দিতে হবে। ২২ তারিখের মধ্যে ডোনার জোগাড় করতে হবে...বাড়িতে যাঁরা রক্ত দিতে পারত তাঁরা সবাই গত ১-২ মাসে রক্ত দিয়েছেন। আমাদের জরুরিভিত্তিতে একজন ডোনার চাই।’
কদিন আগেই একটি নামী প্রাইভেট হাসপাতালে নিউরোসার্জারির জটিল অস্ত্রোপচার হওয়া এক মাঝবয়সি ব্যক্তির জরুরিভিত্তিতে বি পজিটিভ রক্তের দরকার ছিল। কিন্তু প্রথম ২ ইউনিট রক্ত দেওয়ার পর ব্লাড সেন্টার তার মুখের উপর বলে দেয়, হয় ডোনার আনুন। নয়তো যত ইমার্জেন্সিই হোক, আমরা অপারগ! শেষে তাঁর সহকর্মীরা গিয়ে রক্তদান করবার পর মেলে পরবর্তী রক্ত। অবস্থা এমন জায়গায় গিয়েছে, পুজোর সময় রক্তসংকট কাটাতে ১৯ দফার নির্দেশসংবলিত যে সার্কুলার ইস্যু করা হয়েছে, তার ৭ নম্বরে পয়েন্টে রাজ্যই জানাচ্ছে, ‘ব্লাড সেন্টারে আসা রোগীর বাড়ির লোকজনকে রক্ত দিতে উৎসাহদান করতে হবে।’ যার অর্থ পরিষ্কার—ডোনার লাগবে। বলছে সরকারই।
পরিস্থিতি যা, দিনরাত রিফিউজাল চলছে। পাশাপাশি চলছে রক্তের রিকুইজিশন স্লিপ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। এর মধ্যে আয়ুষ্মান ভারত অথবা মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমার সুযোগ নিতে প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী ভরতি বাড়ছে। তাঁদের রক্তের চাহিদা মেটাতে পারছে না হাসপাতালগুলির ইন-হাউস ব্লাড সেন্টারগুলি।
রক্তদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবীরা জানিয়েছেন, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৮টা পর্যন্ত রক্তসংক্রান্ত সরকারি পোর্টাল ই রক্তকোষের হিসাব বলছে, রাজ্যের ভাঁড়ারে সাড়ে ১৬ হাজার ইউনিট রক্ত রয়েছে। কলকাতায় মোট স্টক ১২৯৭ ইউনিট রক্ত। হাওড়ায় ৩৩ ইউনিট, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় স্টক যথাক্রমে ২৩৭ ও ২৫৬ ইউনিট। শুক্রবারই বাঁকুড়া থেকে সেন্ট্রাল ব্লাড সেন্টারে এসেছে ২৯১ ইউনিট রক্ত। রাজ্যের রক্ত নিরাপত্তা শাখার শীর্ষকর্তা ডাঃ বিজয় মুখোপাধ্যায় শুক্রবার জানিয়েছিলেন, রক্তের কোনো সংকট নেই। প্রায় ২০ হাজার ইউনিট রক্ত স্টকে আছে। তিনি এই দাবি করলেও রক্তদান আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব অপূর্ব ঘোষ বলেন, মারাত্মক রক্ত সংকট চলছে। সরকার নিয়মনীতি নিয়ে যতটা কড়াকড়ি করেছে, তার সিকিভাগ যদি স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহ দিতে করত, এমনটা হত না।



