শান্তনু দত্তগুপ্ত: আমার এক বোন আছে। দিল্লিতে থেকে পিএইচডি করছে। জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে। ২৯ বছর বয়স। একটু খ্যাপা। তাই অন্যায় কোনো কিছুর সঙ্গেই মানিয়ে নিতে পারে না। তা সেই অন্যায় বাড়ির লোক করুক, বা দেশের... প্রতিবাদ সে করবেই। সবার সমস্যা নিজের ঘাড়ে নেবে। নিট পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হল, সে রেগে গেল। পরীক্ষা বাতিল হল, একের পর এক ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করল, সে বসে পড়ল অনশনে। ২৩ দিন! অনশন ভাঙার পর খেতে ভুলে গেছিল তার শরীর। শিখেছিল আবার সে... খেতে। শুয়ে ছিল কি হাসপাতালে? না। ওই অবস্থাতেই ছুটেছিল রাঁচি, পাটনা, কলকাতা। রাস্তা থেকে মঞ্চ, সে ভাষণ দেয়। মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করে। আর অবসরে মঞ্চে বসেই ‘রক্তকরবী’ পড়ে। পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়, আটক করে রাখে, ফোন কেড়ে নেয়। সারা গায়ে মারের দাগ নিয়ে পরদিন সে আবার বেরিয়ে পড়ে। প্রশ্ন তোলে... ভোটারদের অধিকার কেন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে?
আমার এক ভাই আছে। ছ’বছর ধরে সে জেলে। বসে আছে শুনানির অপেক্ষায়। জামিনের আবেদনের শুনানি নয়! তাকে যে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সেই মামলার শুনানি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে উসকানি দিয়েছিল। কী প্রমাণ? টিভি চ্যানেলে দেখানো একটি ভিডিয়ো। কোন টিভি চ্যানেল? লোকে গোদি মিডিয়া বলে, তেমন একটি। আইনজীবীরা সেই ফুটেজের আনকাট ভার্সান দেখিয়েছিলেন। ভাই সেখানে অখণ্ড ভারতের কথা বলেছে। সমন্বয়ের কথা বলেছে। একটা অংশ কেটে শুনলে তা জানা যাবে না। তাও শুনানি হয়নি। অপেক্ষায় আছে সে। আশায় আছে, সাংবিধানিক অধিকার একদিন না একদিন ফিরে পাবে।
আমার এক বন্ধু আছে। বাড়িতে ঘুমোচ্ছিল সে। সকাল সাতটা নাগাদ দরজায় ধাক্কা পড়ে। তার মা খুলে দেখে, ৪০-৫০ জন সামনে দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে কয়েকজন ধাক্কা মেরে বৃদ্ধাকে সরিয়ে ঢুকে পড়ে বাড়ির ভিতর। ছড়িয়ে যায় চারদিকে। বন্ধুর বেডরুমে ঢুকে ধাক্কা মেরে তোলে। পুলিশের ইউনিফর্ম ছিল না তাদের গায়ে। আইডি কার্ড বা ওয়ারেন্টও না। পায়ে চটি পর্যন্ত গলাতে দেয়নি তাকে। সোজা নিয়ে গাড়িতে তোলে। তারপর ‘অজ্ঞাত’ কোনো জায়গায়। ২২ ঘণ্টা পর ছাড়া পায় সে। অপরাধ? জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেছিল সে। হারিয়ে যাওয়া অধিকার খুঁজে আনতে চেয়েছিল।
কারা এরা? দেশদ্রোহী? ‘দিল্লি চলো’ ডাক দিয়েছিল বলে? কাতারে কাতারে ছেলেমেয়ে ঢেউ তুলেছিল রাজধানীর সীমানায়। কেউ আসতে চেয়েছিল পাটনা থেকে, কেউ কলকাতা, কেউ চেন্নাই। কিন্তু বাস ঢুকতে পারেনি শহরে। ট্রেন বন্ধ। মেট্রোর শাটার ডাউন। তাও তারা আসতে চেয়েছে। এসেছে। নিজের শহরে, বাসে, ট্রেনে আটক হয়েছে। হাজারে হাজারে এই ছেলেমেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। বাস ভরতি করে। প্রিজন ভ্যানে চাপিয়ে। এরাই দেশদ্রোহী? না, এরাই আমাদের বোন, ভাই বা বন্ধু। নাম জানার দরকার নেই। যা খুশি বসিয়ে নিন... নন্দিনী, বিশু, কিশোর... কিংবা রঞ্জন। এরা একটা প্রজন্ম। আপনার-আমার ছেলেমেয়ের জন্যই লড়ছে। যারা এখনও স্কুলে পড়ে... ভবিষ্যতে যেন তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য দেউলিয়া না হতে হয়। সরকারি স্কুল যাতে বন্ধ না হয়। এই অধিকারের লড়াই লড়ছে বলেই কি তারা দেশদ্রোহী? তারা আর বোন নয়, ভাই নয়, বন্ধু নয়! এরা লড়ছে আপনার পরিচিত সেই ব্যক্তির জন্য... যে আজন্ম এদেশে থেকেও অ-নাগরিক হয়ে গিয়েছে। ভোট দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। আমরা তো যাইনি লড়তে। উনি যাননি। ওই ছেলেমেয়েগুলো গিয়েছে। পুলিশের মার খেয়েছে, শখের মোবাইল বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়া দেখেছে, আটক হয়েছে, তারপরও স্লোগান তুলেছে... ‘জ্ঞানু, ইটস ডান ব্রো’। কী বলা যায় একে? সাহস? নাকি দুঃসাহস? কৌটোয় চিনি ধরানোর জন্য যেমন নীচে বা পাশে চাপড় মেরে জায়গা করা হয়, ঠিক সেভাবেই প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়েছে তাদের। রুলের গুঁতো মেরে। ঠুসে। কারও মুখ ফেটেছে। কারও মাথা। এরাই কি দেশদ্রোহী? তাহলে কিন্তু সংখ্যাটা বাড়ছে। দেশজুড়ে। হাজার থেকে লক্ষ, লক্ষ থেকে কোটি। সিস্টেমের বেড়াজালে হাঁসফাঁস করছে তারা। রাজার জারিজুরি ধরে ফেলেছে। বুঝে নিয়েছে... যাকে পাচ্ছে, রাজা শুষে নিচ্ছে। ছিবড়ে করে ফেলছে অনুপ, উপমন্যু, শকলুদের। তাই বেরিয়ে আসতে চাইছে এই প্রজন্ম যক্ষপুরী থেকে। মনে পড়ে যাচ্ছে বিশুপাগলের সেই সংলাপ... ‘খাঁচার পাখি শলাগুলোকে ঠোকরায়, সে তো আদর করে নয়।’ খাঁচার গায়ে ঠোক্কর দিচ্ছে তারা। ভেঙে ফেলতে চাইছে। আমাদেরই বোন, ভাই, বন্ধু...। আর কারও কারও কাছে দেশদ্রোহী। কোনো ব্যক্তির, কোনো নীতির বিরুদ্ধে তারা সরব হয়েছে বলে। প্রশ্ন করেছে বলে। স্বার্থ কী এদের? পুলিশের মার! জেলযাত্রা! কেরিয়ারে কালো পোঁচ!
‘সর্দার’ বলছে ফ্লপ শো। ঝাঁকে ঝাঁকে ট্রেন বাতিল। ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ। সর্বত্র ব্যারিকেড। লাখ খানেক পুলিশ-নিরাপত্তারক্ষী। তারপরও যদি ফ্লপ শো না বলা হয়, তাহলে কবে বলবে? বিরোধীরা অবরোধ করে, ঘেরাও করে, বন্ধের ডাক দেয়। কিন্তু এই প্রথম আমরা দেখেছি, কোনো সরকার রেল রুখেছে। বন্ধ করেছে সাধারণ মানুষের পথে হাঁটার, দাঁড়ানোর, কাজে যাওয়ার অধিকার। ১০০ মিটার দূরত্বে কাজের জায়গায় যাওয়ার জন্যও তিনটে স্টপ ঘুরে যেতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সুপ্রিম কোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবীকে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রিজন ভ্যানে। পথেঘাটে বেছে বেছে ছাড় দেওয়া হয়েছে মিডিয়াকে (গোদি!)। শো তো ফ্লপ হবেই।
দেওয়াল লিখন কিন্তু স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পক্ষ-বিপক্ষ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। একদল প্রশ্ন করবে, আর একদল নতজানু হবে। যারা প্রশ্ন করবে, তারা আটক হবে পথে নেমে। অধিকার, ন্যায়, বেঁচে থাকা... এই সবই দাঁড়িপাল্লায় চাপিয়ে ব্যয় করা হবে তাদের জন্য। কারণ, যারা নতজানু হবে, তাদের ‘ভাগে প্রাণের সারাংশ অনেকটা বেশি পরিমাণে পড়া চাই।’ ওই যে মনে পড়ে নন্দিনীর প্রশ্ন, ‘এ রাজ্যে বাঁচিয়ে রাখার বুঝি পরিমাণ-বিচার আছে?’ আমার বোনটিরও কি মনে পড়ছে ‘রক্তকরবী’র সেই সংলাপ? যেখানে নন্দিনী প্রশ্ন করছে, ‘কী দোষ করেছ যে এরা তোমাকে বেঁধে নিয়ে চলেছে?’ বিশুর উত্তর, ‘এতদিন পর আজ সত্যকথা বলেছিলুম।’ নন্দিনী বলে, ‘তাতে দোষ কী হয়েছে?’ বিশু জানায়, ‘সত্যের মধ্যে মুক্তি পেয়েছি—এ বন্ধন তারই সত্য সাক্ষী হয়ে রইল।’
সিস্টেম তৈরি করে মানুষ। কিন্তু তারপর সে ধীরে ধীরে ভুলে যায় প্রশ্ন করতে। অক্ষম হয়ে যায় বিবেচনায়। তখন মানুষ হয়ে যায় সিস্টেমের দাস। গিলে খায় তাকে সিস্টেম। তাকে তখন যা বোঝানো হয়, সেটাই হয় সারসত্য। কেউ প্রশ্ন করলে তা হয় দ্রোহের শামিল। ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যায় বোন, ভাই, বন্ধুরা। তখন সবাইকে মনে হয় উলটোদিকে দাঁড়িয়ে। প্রচারের উলটোদিকে। সিস্টেমের উলটোদিকে। আচ্ছে দিনের উলটোদিকে। বিশু বলেছিল, এই পরিস্থিতিতে তাদের ‘ভিতরকার জানোয়ারটার লেজ ফুলতে থাকে, দুলতে থাকে।’ তারা ভুলে যায় মনুষ্যত্ব, সম্পর্ক। মগজধোলাই যন্ত্রে যেন তাদের সফর হয়ে গিয়েছে। ভাবছে তারা, আমার ছেলেমেয়ের জন্যই এসব করা। কর্তব্য করছি আমরা। দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু ভুলে যাচ্ছে... এই ছেলেমেয়েগুলো তো তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্যও লড়ছে! তাদের প্রতি কোনো দায়িত্ব কি এই খোলকরতাল বাজানেওয়ালাদের নেই? একদিন কি এমনও আসবে না, যখন তাদের রাজদণ্ডও নতজানু হবে? কোনো বোন, কোনো ভাই বা বন্ধুর ডাকে তারাও সাড়া দেবে। নিঃশব্দে কোনো রঞ্জন পথ দেখাবে তাদেরও। বন্দিশালা ভাঙতে তারাও এগবে। তখন আর দুটো আলাদা পক্ষ বলে কিছু থাকবে না। সবাই দাঁড়াবে এক লাইনে। অধিকার রক্ষার স্বার্থে। মনে পড়বে কি তখন নন্দিনীর সেই কথাটুকু... ‘রঞ্জন বেঁচে উঠবে—ও কখনো মরতে পারে না।’



