তন্ময় মল্লিক: ‘লাশ রাজনীতি’ বঙ্গবাসীর কাছে অত্যন্ত পরিচিত। রাজনৈতিক সংঘর্ষে মারা গেলে তো বটেই, কেউ আত্মঘাতী হলেও বিরোধীপক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা হয়। এ ব্যাপারে কংগ্রেস, সিপিএম, বিজেপি, তৃণমূল কেউ কারোর চেয়ে কম নয়। ‘লাশ’ প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের এক মোক্ষম হাতিয়ার। এক সপ্তাহে খুন হয়েছেন তিনজন। মৃতদের পরিবারের দাবি, প্রত্যেকেই বিজেপি। কিন্তু, মৃত্যু নিয়ে শাসক দলের হেলদোল নেই। নেই রণং দেহি হুংকার। প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যে পালা বদলে কি সেই ধারাও পালটে গেল? নাকি ‘লাশ রাজনীতি’তে শাসক দলের অরুচি? তবে অনেকে বলছেন, উপরদিকে থুতু ছুড়লে তা নিজের গায়ে এসে পড়ে। সেটা বুঝেই শাসক দল বিজেপি স্পিকটি নট।
রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় বসার পর পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরে ও বীরভূম জেলার বোলপুরে মোট তিনজন খুন হয়েছেন। ব্যক্তিগত রেষারেষি নাকি রাজনৈতিক কারণে এই খুনোখুনি, তা জানা যাবে পুলিশি তদন্ত শেষে। তবে, মৃতরা প্রত্যেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারমধ্যে খড়্গপুরের হাতিহল্কায় যে দু’জন মারা গিয়েছেন, তাঁরা সংখ্যালঘু। অভিযুক্তও মুসলিম। খুন হয়েছেন দুই শিবিরের দু’জন। উভয়পক্ষই নিজেদের বিজেপি বলে দাবি করছে। তাহলে আবার সংঘাত কেন?
এখানেও সেই চিরাচরিত আদি-নব্যের দ্বন্দ্ব। যে দু’জন খুন হয়েছেন তাঁদের একজন ২০২৪ সাল থেকে বিজেপি করছেন। অন্যজন শমীক ভট্টাচার্যের ভাষায় ‘চার ঘণ্টায় বিজেপি’। পরিবর্তনের বাংলায় উভয়পক্ষই শাসক দলের ছাতার তলায় থাকতে চাইছে। সুযোগ পেলেই নিজেদের বিজেপি প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠছে। সৌমেন তেওয়ারি সভাপতি হতেই একপক্ষ মেদিনীপুরে ছুটলেন তাঁকে সংবর্ধনা দিতে। অন্যপক্ষ গ্রামে মিছিল করেই দাপট দেখাল। পালটা মিছিল করল আদিরাও। তাকে ঘিরেই তুমুল সংঘর্ষ। মারা গেলেন দু’জন।
মৃতদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন সবাইয়ের দাবি, তাঁরা বিজেপি করতেন। কিন্তু, বিজেপি নেতৃত্ব কিছুতেই তা মানতে চাইছে না। নেতৃত্ব সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ‘এর সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক নেই। বাজার দখলের লড়াই।’ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এড়াতেই কি মৃতদের দলীয় কর্মী বলতে অস্বীকার? একটা সময় কেউ খুন হলেই ‘ডেডবডি’ নিয়ে টানাটানি চলত। মৃতকে নিজেদের দলের কর্মী বলে দাবি করত। উদ্দেশ্য মৃতদেহকে হাতিয়ার করে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করা।
এ ব্যাপারে নজির সৃষ্টি করেছিল অর্জুন চৌরাশিয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যু। কাশীপুরের পরিত্যক্ত রেল কোয়ার্টার থেকে উদ্ধার হয়েছিল বিজেপির যুব মোর্চার নেতা অর্জুনবাবুর ঝুলন্ত দেহ। তৃণমূল খুন করেছে অভিযোগ তুলেছিল বিজেপি। সেই সময় বাংলায় এসেছিলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ‘লাশ রাজনীতি’র পালে হাওয়া দিতে কর্মসূচি কাটছাঁট করে তিনি ছুটেছিলেন কাশীপুরে। আঙুল তুলেছিলেন তৃণমূলের দিকে। কিন্তু, কেন্দ্রীয় সংস্থার অধীনস্থ চিকিৎসকদের করা ময়না তদন্তে প্রমাণ হয়, অর্জুন আত্মহত্যা করেছেন।
তবে, বোলপুরে যিনি খুন হয়েছেন, সেই চন্দন ভল্লা বিজেপির নেতা। ২০২১ সাল থেকে তিনি ২০১ নম্বর বুথের সভাপতি। ফলে তাঁকে ‘চার ঘণ্টায় বিজেপি’ বলে দাগিয়ে দিয়ে নীরব থাকার সুযোগ নেই। নিহত চন্দনবাবুর ছেলে শুভকান্তি ঘটনার দিনই বাবাকে খুনের জন্য বিজেপির দিকে আঙুল তুলেছিলেন। তবে, ছেলের মন্তব্যে বিজেপি শিবিরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তাকে ঢেকে দিয়েছেন চন্দনবাবুর স্ত্রী শ্যামলীদেবী। তিনি তৃণমূলকেই দায়ী করেছেন। বিজেপি নেতৃত্ব চাইলেই শ্যামলীদেবীর অভিযোগকে হাতিয়ার করে তৃণমূলকে আরও ঠুসে দিতে পারত। কিন্তু, সেই রাস্তায় না গিয়ে চন্দনবাবুর খুন নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই বিজেপি মুখে কুলুপ এঁটেছে। বিজেপির জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডলের আক্ষেপ, ‘দল ক্ষমতায়। তবুও আমাদের কর্মী খুন হচ্ছেন।’
চন্দন ভল্লা খুনের ঘটনায় পুলিশ দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু, এখনও পর্যন্ত খুনের মোটিভ কী, জানায়নি। ফলে খুনের কারণ জমি কারবারের টাকা ভাগাভাগি, বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, নাকি তৃণমূলের প্রতিহিংসা, কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না। তাতে খুনের কারণ নিয়ে শুধু বিভ্রান্তিই বাড়ছে না, পুলিশের দক্ষতা নিয়েও লোকজন দু’চার কথা বলার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দলীয় নেতা কর্মীদের খুন নিয়ে বিজেপি এত নিস্পৃহ কেন? সাধারণত বোমা বাঁধতে গিয়ে কেউ মারা গেলে সবাই তার ছোঁয়াচ এড়িয়ে চলে। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, মৃতের পরিবারের লোকজনও ঘটনার কথা বেমালুম চেপে যেতে চায়। প্রিয়জনের মৃতদেহ খড়চাপা দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করে। পরিবারকে নিয়ে টানাটানির ভয়ে কেউ আবার নদীতে দেহ ভাসিয়ে দেয়। লক্ষ্য, প্রমাণ লোপাট। কেউ কান্নাকাটিও করে না। এতটাই স্বাভাবিক থাকে যে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, কিছুই হয়নি। দলীয় কর্মীর খুনের ঘটনায় বিজেপির আচরণ কি ঠিক তেমনটাই? রাজ্যের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সঙ্গে বিজেপির যোগ নেই বলে নেতৃত্ব বারবার দাবি করছে। প্রতিপক্ষের উপর হামলা, এমনকি বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে কিছু ঘটলেও দায় চাপানো হচ্ছে বিরোধীদের ঘাড়ে। এভাবেই বিজেপি তাদের অপকর্ম আড়াল করতে চাইছে। কিন্তু, সম্প্রতি এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা বিরোধীদের ঘাড়ে চাপানো যাচ্ছে না। ২৫ সেপ্টেম্বর বিজেপি কয়েকটি জেলায় সভাপতি পরিবর্তন করেছে। তাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। কোথাও কোথাও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। তবে, সকলকে টেক্কা দিয়েছে পূর্ব বর্ধমান। যে সাতটি জেলার সভাপতি পরিবর্তন করা হয়েছে তারমধ্যে বর্ধমান-দুর্গাপুর সাংগঠনিক জেলাও আছে। এই জেলার সভাপতি ছিলেন অভিজিৎ তা। তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে দলের মধ্যে ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু, তাঁকে জেলা সভাপতির পদ থেকে সরানোর পর দলের কর্মীরা যেভাবে গঙ্গাজল ছিটিয়ে ও মন্ত্রোচ্চারণ করে পার্টি অফিসের শুদ্ধিকরণ করেছেন, তা নজিরবিহীন।
এতদিন তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে থাকা পুরসভা, পঞ্চায়েত বা সমবায় ব্যাংক দখল করলে বিজেপি শুদ্ধিকরণ করত। এমনকি, একই বেদিতে দু’টি দল শহিদ স্মরণের অনুষ্ঠান করলে গোবরজল দিয়ে ধুয়ে কর্মসূচি পালন করার ঘটনাও ঘটেছে। এসব করে তাঁরা বোঝাতে চাইতেন, এতদিন যিনি এই চেয়ারে বসেছিলেন, তিনি অনেক অন্যায় করেছেন। পাপ করেছেন। তাঁর কাজের জন্য চেয়ার এবং অফিস অপবিত্র হয়েছে। তাই সেই চেয়ারে নতুন কেউ বসার আগে শুদ্ধিকরণ করা দরকার। চেয়ার ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তি এবং দলকে জনগণের চোখে ছোটো, অপদস্থ করাই যে এর উদ্দেশ্য, তা বলাই বাহুল্য।
এতদিন বিজেপির শুদ্ধিকরণ দেখে মানুষ মজা পেত। হাসাহাসি করত। কিন্তু, নিজের দলের সভাপতি বদলের পর পার্টি অফিস শুদ্ধিকরণে মানুষ শুধু বিস্মিত নয়, স্তম্ভিতও। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, নিজের দলের জেলা সভাপতিকে যাঁরা এই চোখে দেখেন তাঁরা সবাইকে নিয়ে চলবেন কী করে?
ক্ষমতা দখল ও কর্তৃত্ব কায়েম নিয়ে রাজ্যজুড়ে বিজেপিতে লড়াই চলছে। মারামারি, ভাঙচুর, সবই হচ্ছে। তবে, কাঁথির দেশপ্রাণ ব্লকের আমতলিয়া পঞ্চায়েতের প্রধান নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে, তাকে ন্যক্কারজনক বললেও কম বলা হয়। তৃণমূলের ছেড়ে যাওয়া প্রধানের চেয়ারে কে বসবেন, তাই নিয়ে বিজেপির দুই গোষ্ঠীর মধ্যে চলে লড়াই। মণ্ডল সভাপতি যাঁকে প্রধান হিসাবে চাইছিলেন সহ সভাপতির তাঁকে পছন্দ নয়। প্রধানের চেয়ারে বসেন মণ্ডলের সহ সভাপতির পছন্দের প্রার্থী। দলীয় নির্দেশ অমান্য করায় সহ সভাপতিকে শোকজ করেন মণ্ডল সভাপতি। তিনদিনের মধ্যে জবাবদিহি করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু, উত্তর দেওয়া দূরের কথা, মণ্ডল সভাপতির পাঠানো চিঠি কুত্তার লেজে বেঁধে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর কাছে শোকজের গুরুত্ব ঠিক কতটা!
পালাবদলের পর রাজ্য বিজেপির অভিভাবক শমীক ভট্টাচার্য দলের বিবেকের মতো সদাসর্বদা নেতা-কর্মীদের সংযত হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। তারপরেও দলীয় সভাপতিকে সরিয়ে দেওয়ার আনন্দে কোথাও ডিজে বাজিয়ে উল্লাস চলেছে, কোথাও গঙ্গাজল ছিটানো হয়েছে। আবার কোথাও নেতৃত্বের নির্দেশকে থোরাই কেয়ার করেন বলে বুঝিয়ে দিতে কুকুরের লেজে বেঁধে দিয়েছেন শোকজের চিঠি। এসব দেখে শমীকবাবু বুঝতে পারছেন, কুত্তার লেজ যদিওবা সোজা করা যায়, দলের বেয়ারা কর্মীদের সিধে করা প্রায় অসম্ভব। তাই দলের ‘বিবেক’ এখন ‘দার্শনিক’। উদাসীনতাই তাঁর সম্বল।