


তন্ময় মল্লিক, গোঘাট: আরামবাগকে রেলপথের সঙ্গে যুক্ত করার কৃতিত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আরামবাগকে মেডিকেল কলেজ উপহার দিয়েছেন তিনিই। তারপরেও আরামবাগ মহকুমার চারটি বিধানসভা আসনেই গতবার হেরেছে তৃণমূল কংগ্রেস। ভোটের হাওয়া জানার সময় এই প্রশ্নটাই চায়ের দোকানের আড্ডায় ও পথচলতি মানুষের কাছে রেখেছিলাম। বেশিরভাগেরই উত্তর, ‘দিদি যা দিয়েছেন তা কেউ কোনোদিন দেয়নি। মানুষ দিদির উপর খুশি।’
স্থান খানাকুলের রাজহাটি বাজার। কাঠফাটা রোদ। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সভা উপলক্ষে বাজছে মাইক। একটা চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া লোকজনের কাছে ভোটের হাওয়া কোন দিকে জিজ্ঞাসা করি। একজন বললেন, ‘এখানে হওয়া নয়, নেতারা কী চাইছে, সেটাই বড় কথা।’ ঠিক বুঝলাম না বলতে ভদ্রলোক বললেন, ‘এখানে তৃণমূলের কিছু নেতা আছেন যাঁরা চান, পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে থাক। সরকারটা তৃণমূলেরই থাকুক। কিন্তু বিধায়ক হোক অন্য দলের।’
এমন অদ্ভুত চাহিদার কারণ কী জিজ্ঞাসা করায় ভদ্রলোক বললেন, ‘বুঝলেন না? পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি হাতে থাকলে ঠিকাদারি করা যাবে। কামাইয়ের রাস্তা খোলা থাকবে। কেউ বাধা দেবে না। কিন্তু, বিধায়ক দলের হলে খবরদারি করবে। সেই কারণে নেতারা ততটাই খাটে যতটা না খাটলে দল রেগে যাবে। তাই সাধারণ মানুষ দিদিকে চাইলেও এলাকার বেশিরভাগ নেতা চান না, তৃণমূল জিতুক।’ পাশে বসা লোকজন যেভাবে সম্মতি জানালেন তাতে বোঝা গেল ভদ্রলোক ভুল কিছু বলেননি।
শুধু খানাকুলেই নয়, একই কথা শোনা গিয়েছে গোঘাটেও। খানাকুলের দু’নম্বর পঞ্চায়েত সমিতি ও কয়েকটি পঞ্চায়েত বিজেপির দখলে থাকলেও গোঘাটের সবই তৃণমূলের দখলে। তা সত্ত্বেও গোঘাট আসনে তৃণমূল জিতবেই, একথা শাসক দলের নেতারাও বুক ঠুকে বলতে পারছেন না। কামারপুকুর মঠ ও মিশন এলাকার পঞ্চায়েতটি তৃণমূলের দখলে। অথচ সেখানে হাওয়া বিজেপির দিকে। সাদা বোঁদে কেনার সময় এক দোকানদারের কাছে জানতে চাইলাম, হাওয়া কোন দিকে? ভদ্রলোক বলেন, ‘এদিকে বিজেপির পাল্লাই ভারী।’ কারণ জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘অত বলতে পারব না। আমরা ব্যবসা করি। রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাই না।’
মিষ্টির দোকানে উত্তর না পাওয়া গেলেও মিলল চায়ের দোকানে। ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনিই খোলসা করলেন বিষয়টা। বললেন, ‘এখানে কিছু ব্যবসায়ী আছে যারা রাজনীতিটা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা নিজেদের স্বার্থেই পঞ্চায়েতে তৃণমূলকে জেতায়। পুকুর ভরাট, বেআইনি নির্মাণ সহ নানান অপকর্ম করে। তার দোষ গিয়ে পড়ে তৃণমূলের উপর। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তারাই বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে বিজেপিকে জেতায়। তাতে বিজেপি খুশি, তৃণমূলও খুশি। আর এখানে তৃণমূলের প্রার্থী জিতলে তো যারা পঞ্চায়েতে করেকম্মে খাচ্ছে তাদের বাড়া ভাতে ছাই পড়বে। সেই কারণে অধিকাংশ নেতা এখানে উপর উপর ভোট করছে। আন্তরিকভাবে খাটছে না।’
ভোট-অঙ্কের বিচারে বিজেপি কিছুটা ফ্রন্টফুটে থাকলেও গোঘাট এবং খানাকুলের লড়াই এবার হাড্ডাহাড্ডি। শাসক দল ‘কাঁটা’ উপড়ে ফেলতে পারলেই বদলে যাবে অঙ্ক।