Bartaman Logo
৭ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

কালীগঞ্জের রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরীকে আজও দশমীতে দেওয়া হয় পান্তাভাতের ভোগ

প্রাসাদের মতো বাড়ি। দেওয়ালে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তার মধ্যেই কিছু অংশে নতুন করে মেরামতির চিহ্ন

কালীগঞ্জের রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরীকে আজও দশমীতে দেওয়া হয় পান্তাভাতের ভোগ
  • ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সন্দীপ পাল, কালীগঞ্জ: প্রাসাদের মতো বাড়ি। দেওয়ালে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তার মধ্যেই কিছু অংশে নতুন করে মেরামতির চিহ্ন। এক সময় যে বাড়িতে সারাবছর মানুষের আনাগোনা লেগে থাকত, এখন সেখানে নিস্তব্ধতা। ঠাকুরদালানের মেঝেতে ধুলোর আস্তরণ পড়ে থাকে বছরের বেশির ভাগ সময়। উৎসবের মরশুম না এলে বাড়ির আনাচকানাচ থেকে মানুষের গলার আওয়াজও বিশেষ শোনা যায় না। তবে দুর্গাপুজো এলেই বদলে যায় সেই ছবি। কয়েক দিনের জন্য জেগে ওঠে কালীগঞ্জের রায়চৌধুরী বাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রীতি মেনে ঠাকুরদালানে পুজোর আয়োজন শুরু হয়। জমিদারি নেই, কিন্তু, ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা দুর্গাপুজোর রীতি পরিবার আজও ধরে রেখেছে। স্থানীয়দের কাছে এই বাড়ি ‘বাবু বাড়ি’ নামেই বেশি পরিচিত।

Advertisement

পরিবারের সদস্যদের কথায়, এই পরিবারের আদি পুরুষ পুর্ণচন্দ্র গুপ্তশর্মা বাংলাদেশের ঢাকার গয়েশপুর থেকে এসে বসতি গড়েন। তাঁর পুত্র হারাধন গুপ্ত শর্মার সময় থেকেই জমিদারি প্রথার সূচনা। পরে ইংরেজদের দেওয়া রায়চৌধুরী উপাধিতে হারাধন রায়চৌধুরী নামেই পরিচিত হন তিনি। 
পরিবারের দাবি, তাঁদের বাড়িতে আগে থেকেই দুর্গাপুজো হয়ে আসছিল। তবে হারাধন রায়চৌধুরীর সময় থেকেই পুজোয় জমিদারবাড়ির আভিজাত্য যোগ হয়। তখন থেকেই ১৭ ফুটের একচালা কাঠামোর উপর প্রতিমা তৈরি করার রীতি শুরু হয়। আজও সেই কাঠামো রয়েছে। সময়ের সঙ্গে অবশ্য সুবিধার জন্য একচালা কাঠামোটি দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। রথের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রতিমা তৈরির কাজ। এই বাড়ির প্রতিমার রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। দেবীর গাত্রবর্ণ হলুদ। অসুরের রং সবুজ। পুজোর বেশ কিছু নিয়মও এখনো আগের মতোই মেনে চলা হয়। বাড়ির পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও পুজোর কাজে সমানভাবে অংশ নেন।
পঞ্চমীর দিন বেলতলায় ঘট স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পুজোর আচার। ষষ্ঠীর পুজো হয় ঠাকুরঘরে। বিকালে বাড়ির বেলতলায় হয় অধিবাস। সপ্তমীর দিন বাড়ি থেকে দুর্গামণ্ডপে নিয়ে আসা হয় গৃহদেবী ভুবনেশ্বরীকে। তার পরেই হয় প্রতিমার প্রাণপ্রতিষ্ঠা। তিনদিন মণ্ডপে বিরাজ করেন ভুবনেশ্বরী।
এই গৃহদেবীকে ঘিরেও রয়েছে পরিবারের পুরানো ইতিহাস। পরিবারের সদস্যদের কথায়, চাদরার কেদার রায়ের গৃহদেবী ভুবনেশ্বরীই এক সময় এই পরিবারে পূজিত হতেন। ১৯৯৪ সালে সেই দেবী চুরি হয়ে যাওয়ার পরে নতুন করে ভুবনেশ্বরী দেবীর প্রতিষ্ঠা করা হয়। অষ্টমীর দিন নিয়ম মেনে হয় কুমারী পুজো। নবমী ও দশমীর পুজোতেও পুরনো রীতি বজায় রয়েছে। নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয় দেবীকে। তবে এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব দশমীর পান্তা ভাতের ভোগ। নবমীর রাতে মাটির হাঁড়িতে ভাত রান্না করা হয়। সেই ভাত জল দিয়ে রেখে পরের দিন পান্তা করে দেবীকে ভোগ দেওয়া হয়। পরে কলা, দই, কাসুন্দি-সহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সেই প্রসাদ ভাগ করে নেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্য দীপক সেন শর্মা বলেন, এক সময় এই বাড়ির দুর্গাপুজোয় পশুবলি হত। সপ্তমীতে সাতটি, অষ্টমীতে আটটি এবং সন্ধিপুজোয় একটি, নবমীতে ন’টি পশু বলি দেওয়া হত। পরে পরিবারের সদস্যরা আলোচনার মাধ্যমে সেই প্রথা বন্ধ করে দেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ