সংবাদদাতা, বিষ্ণুপুর: মল্লরাজা বলিপ্রথা বন্ধের নিদান দিয়েছিলেন। কিন্তু নারায়ণ ও মাতৃশক্তি আদতে একই। একথা বোঝাতে সক্ষম হওয়ায় আজও পাত্রসায়রের বালসি গ্রামে ভট্টাচার্য পরিবারের পুজোয় তিনদিন ধরে বলি হয়। তার মধ্যে মহাষ্টমী ও নবমীতে ছাগবলি এবং সপ্তমী ও নবমীতে চাল কুমড়ো বলি হয়। সাবেকি গড়নের একচালার পুজোয় দশমির দিন নৈবেদ্য হিসাবে বাসি ভাতের সঙ্গে চ্যাং মাছ পোড়া দেওয়া হয়। এছাড়াও প্রসাদ বিলি এবং ধুমধাম করে শোভাযাত্রার মাধ্যমে বিসর্জন হয়।
ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যরা বলেন, বালসি গ্রামের নবকিশোর পাড়ার বড়োকালীতলায় প্রায় ২০০ বছর ধরে পুজো হয়ে আসছে। পরিবারের কোনো এক পূর্বপুরুষ প্রথম পুজো প্রচলন করেন। সেটি বড়োবাড়ির পুজো বলে পরিচিত। পরবর্তীকালে পরিবার বিভক্ত হওয়ায় পৃথকভাবে আরও দু’টি পুজো প্রচলন হয়। প্রথম থেকেই শাক্ত মতে হয়ে আসছে। কিন্তু, তৎকালীন মল্লরাজা বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় এলাকার প্রায় সমস্ত পুজোয় বলি প্রথা বন্ধের নির্দেশ দেন। সেই মতো বহু জায়গায় ছাগবলি বন্ধ হয়ে যায়। পরিবর্তে চাল কুমড়ো বলি হয়। কিন্তু, ভট্টাচার্য পরিবারের এক পূর্বপুরুষ প্রচলিত বলিপ্রথা ভাঙতে নারাজ হন। বরং তিনি রাজার প্রতিনিধির সঙ্গে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ করেন। নারায়ণ এবং মাতৃশক্তি যে একই। সেকথা তিনি যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। অবশেষে তাঁর যুক্তির কাছে হার মেনে রাজার প্রতিনিধি বলি প্রথা বন্ধের পরিবর্তে বালসির বালেশ্বর তলায় একটি পুকুর খনন করান। সেই পুকুর থেকে পুজোর মাছের ব্যবস্থা করে যান। তর্কযুদ্ধে জয়ী হওয়ায় তাঁকে তর্কবাগিশ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরবর্তীকালে পরিবারের এক গৃহবধূ মা দুর্গার দর্শনলাভ করেন। তাঁর অনুরোধে স্বামী পীতাম্বর ভট্টাচার্য স্থানীয় ভারু পুষ্করিণীর পাশে নতুন মন্দির তৈরি করে পৃথকভাবে পুজো শুরু করেন। সেই পুজো পরবর্তীকালে রঘুমনি ভট্টাচার্য এবং বর্তমানে ফকির ভট্টাচার্যের উত্তরসূরিরা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে চালিয়ে আসছেন। পুরোহিত কালীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, পুজোর দিনগুলিতে অন্নভোগের ব্যবস্থা থাকে।
পরিবারের সদস্য বিদ্যুৎ ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের পুর্বপুরুষদের প্রথম চালু করা বড়োবাড়ির পুজো আগে শুরু হয়। তাঁর অনুমতি নিয়ে আমাদের পুজো শুরু করা হয়। দশমীর দিন নরনারয়ণ সেবা অনুষ্ঠিত হয়। অপর সদস্য প্রতাপ ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের স্থায়ী মন্দিরে একচালার উপর সাবেকি গড়নের প্রতিমা হয়। ডাকের সাজে মাকে সাজানো হয়। পাত্রসায়রের এক সূত্রধর পরিবার বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরি করেন। পুজোয় আত্মীয়স্বজনরা আসেন। সকলে মিলে পুজোর কটাদিন ভীষণ আনন্দের মধ্যে কাটে।