


সংবাদদাতা, কাটোয়া: পূর্বস্থলীর নতুনগ্রাম কাষ্ঠশিল্পীদের গ্রাম বলেই চিহ্নিত। এখানকার শিল্পীদের কাঠের তৈরি নানা পুতুল রাজা-রানি, গৌর-নিতাই, লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা দেশ বিখ্যাত। কিন্তু এই নতুন গ্রামে আরও এক হস্তশিল্প লুকিয়ে রয়েছে। পুরুষরা এখানে কাঠের তৈরি জিনিসপত্র তৈরি করে সুনাম কুড়িয়েছেন। আর স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা বাঁশের তৈরি জুয়েলারি করে রাজ্যে তোলপাড় ফেলে দিচ্ছেন। এখানকার বাঁশের তৈরি জুয়েলারি পাড়ি দিচ্ছে বেঙ্গালুরু, অসম, মুম্বই-এর মতো শহরে। এমনকী, বাঁশের তৈরি গয়না তৈরি করে বহু পরিবারের মহিলাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এসব গোষ্ঠী।
নতুন প্রজন্মের কাছে হ্যাণ্ডমেড জুয়েলারির চাহিদা খুব বেশি। এই গয়নাগুলি মূলত ইউনিক ডিজাইন এবং হস্তশিল্পের কারণে বাজার দখল করে নিচ্ছে। অনেকেই ঘরে বসে নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে এই ধরনের গয়না তৈরি করে আয় করছেন। ভারতে ২০২৫ সালের ব্রাইডাল জুয়েলারির ট্রেন্ডে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে তৈরি হ্যান্ডমেড গয়না বিশেষ নজর কেড়েছে। এখন এটা ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। বাঁশ ফাটিয়ে তার ছিল দিয়ে নানা মডেল তৈরি হয়। তা থেকেই মহিলাদের জন্য হরেক ডিজাইনের গয়না সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। পূর্বস্থলী -২ ব্লকের পিলার নতুনগ্রামের মহিলারা গ্রামীণ নানা মডেল দিয়ে সেসব গয়না তৈরি করেন। মেঠো বাউলের একতারা থেকে নানা দেব, দেবীর মূর্তির ছোটো মডেল তৈরি হয়।
নতুনগ্রামের শিল্পী সান্তনা মণ্ডলের কথায়, এখন সোনার গয়না অনেকেই পরেন না। তার জন্যই আমাদের মতো গ্রামের গরিব পরিবারগুলির মহিলাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে। তাঁরা সংসারের কাজ সামলে নানা ডিজাইনের হ্যাণ্ডমেড জুয়েলারি বানাচ্ছেন। বাঁশের তৈরি পরিবেশবান্ধব গয়নার চাহিদাই বেশি।
প্রতি বছরেই বদলে যায় ফ্যাশনের ট্রেন্ড। গত কয়েকটি বছর ধরে গয়নার ট্রেন্ডে ছোঁয়া লাগছে পরিবেশ-বান্ধবতার। ফলে বাঁশ, পাট, সুতো, কড়ি, গামছা, কাপড়ের পাড়, মাটির উপরেই বেস করে তৈরি হচ্ছে গয়না। সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে হরেক থিম। দুর্গাপুজোর সাবেক দুর্গামূর্তি, ত্রিশূল, গণেশ, সরস্বতী, লক্ষ্মী তো আছেনই। সাহিত্য-সিনেমাও অনুপ্রাণিত করছে এসব ট্রেন্ডি গয়নাকে।
অগ্রদ্বীপের বাসিন্দা মল্লিকা সরকার, মাম্পি মণ্ডল, মিঠু দত্তরা বলেন, আমাদের স্বামীরা কাঠের পেঁচা তৈরি করেন। কেউ আবার মাঠে কাজ করেন। আমরা এসব গয়না তৈরির কাজ শিখে নিয়েছি। এখন মাসে ভালোই আয় হচ্ছে। সংসারটা তো চলে যাচ্ছে। আগে আমাদের সংসার চলত শুধু একজনের আয়ের উপরে। এখন স্বনির্ভর হয়েছি। রাজ্যের সৌজন্য কাজের জন্য ঋণ মিলছে। সংসারে বাড়তি পয়সার জোগান আমরা দিতে পারছি। আরএক শিল্পী বলেন, ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ বাঁশের গয়না বানিয়ে সেখান থেকে পাওয়া টাকায় চলে যাচ্ছে। বাঁশ কেটে তার উপর নানা কাপড় জড়িয়ে মডেল তৈরি করি। আবার তামার তার দিয়েও নানা ডিজাইনের লকেট বানিয়ে থাকি। বাঁশের এসব ট্রেন্ডি গয়নার কারুকাজ দেখে অনেকেই বলছেন, সোনার গয়না ভারি। তারপরে সেটা আবার মহার্ঘ্য। তার চেয়ে এসব গয়না ফ্যাশানেবল। তাই তো নতুনগ্রামের গ্রামীণ মহিলাদের বাঁশের গয়নার সৌন্দর্য চোখ টানছে ক্রেতার।