অভিজিৎ পাল, বহরমপুর: মণ্ডপে মণ্ডপে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, চারিদিকে আলোর রোশনাই আর ঢাকের বাদ্যি। জানান দিচ্ছে উমার আগমনী বার্তা। মা আসছেন বহরমরপুরের মণ্ডলবাড়িতেও। পাঁচ বছর আগে মানবতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পুজো শুরু। এবারও শাস্ত্রীয় রীতি ও সামাজিক দূরত্বের গণ্ডি পেরিয়ে এক অনন্য মানবতার ছবি ফুটে উঠছে মণ্ডলবাড়িতে। এখানে দেবীদুর্গা পুজিত হন সমাজের বিভেদ ভাঙার এক বিশেষ প্রতীক হিসেবে। মা দুর্গাকে এ বাড়ির ‘বড় মেয়ে’।
মণ্ডলবাড়ির পুজোর প্রধান আচার হল জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কুমারী মেয়ে দেবী রূপে পুজো করা। প্রতি বছরের মতো এবারও জেলার বিভিন্ন প্রান্ত এবং নানা পটভূমির ১০ জন কন্যাকে কুমারী হিসেবে পুজো করা হচ্ছে। এই বৈচিত্র্যের আবহেই উঠে এসেছে বিভেদহীন সমাজের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এবছর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার) সাত বছরের শিশুকে মণ্ডলবাড়ির দশম কুমারী হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। সমাজের নানা ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আদিবাসী ও ব্রাহ্মণ কন্যার পাশাপাশি এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুটিও একই আসনে দেবী রূপে পূজিত হচ্ছে। বিশ্ব মানবতার মন্ত্রে দিক্ষীত হয়ে এমন এক অনন্য পুজোর সূচনা করেছিলেন মণ্ডলবাড়ির কর্তা স্বর্গীয় হরিহর মণ্ডল এবং ললিতা মণ্ডলের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ। তাঁর হাত ধরেই বড় মেয়ের এই বিশেষ আরাধনা আজ এক মহীরূহে পরিণত হয়েছে। পুত্রবধূ সঞ্চালী মণ্ডলের কথায়, ‘মায়ের তো কোনো আলাদা রূপ, জাতি বা ধর্ম হয় না। মায়ের স্থান সর্বজনীন।’ বর্তমান সমাজে অটিজম নিয়ে মানুষের মনে এখনও অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে ছোট্ট আরভির এই পুজোয় অংশ নেওয়া সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—কোনো অটিস্টিক শিশু সাধারণ মানুষের জন্য ভীতি বা ক্ষতির কারণ নয়। ভালোবাসা ও সম্মানের সঠিক সুযোগ পেলে তারাও সমাজের মূলস্রোতেরই এক সুন্দর অংশ। উৎসবের আলোকমালায় বহরমপুরের মণ্ডলবাড়ি এভাবে প্রতি বছর প্রমাণ করে চলেছে—মানবধর্মই শেষ কথা।
সঞ্চালী মণ্ডল বলেন, ‘নিষ্ঠা ভাবে পুজো তো হয়। সেই সঙ্গে দশ কুমারীর পুজো এখানে অনন্য। বহু দূর দুরন্ত থেকে মানুষ এসে এই পুজোয় অংশ নেন। বিভেদ ভুলে পাঁচ বছরের মধ্যেই সকলের পুজো হয়ে উঠেছে আমাদের বাড়ির বড় মেয়ের পুজো।’



