কুরসি ছেড়ে বিদায় নেওয়ার দাবি উঠেছে। ২০২৫-এর জুন মাসে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর শুরুর পর থেকে গত পনেরো মাসে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন কম ওঠেনি। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের আশীর্বাদের লম্বা হাত মাথার উপর থাকায় তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন অকুতোভয়। কথায় আছে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। মাত্র কয়েকদিন আগে একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসতেই যেভাবে কার্যত নতিস্বীকার করতে শুরু করেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, তাতে পরিষ্কার এবার তাঁর কুর্সি রক্ষা করতে বেশ বেগ পেতে হবে। এতদিন কমিশনের তাঁর দুই সহকারীকে পাশ কাটিয়ে একাই যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেকে ‘সুপার পাওয়ার’ (অভিযোগ তেমনই) হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এমনকি দুই সহকারীর তোলা ১৪টি আপত্তিকর ‘নোট’ হেলায় অবজ্ঞা করেছিলেন বলে অভিযোগ। এখন সেইসব আপত্তিকেই গুরুত্ব দিয়ে সমালোচনা ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা হল, গোটা দেশজুড়েই তাঁর পদত্যাগের দাবিতে মানুষ সোচ্চার হতে শুরু করেছে। ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে দেশের প্রায় সব বিরোধী দল এবং ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ দিল্লি, মুম্বই সহ বিভিন্ন বড়ো শহরে পথে নেমেছেন। দাবি মূলত একটাই, জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা। সেইসঙ্গে গোটা নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার। এই ওষুধে কাজ না হলে আগামীদিনে আন্দোলনের ঝাঁঝ যে আরও বাড়বে— তাতে সন্দেহ নেই।
ইস্তফার দাবি ও জনগণের ক্ষোভের এই দেওয়াল লিখন বোধহয় পড়তে পারছেন জ্ঞানেশ কুমার ও তাঁর মনিবরা। তাই পিছু হটে এখন প্রায়শ্চিত্ত শুরু হয়েছে। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের নামে আসলে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে প্রকৃত বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে প্রথম থেকেই অভিযোগ উঠেছিল। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যই বলছে, এ পর্যন্ত যে ২০টি রাজ্য এসআইআর-এর কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তাতে ১৩ কোটির বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এতদিন এই নিয়ে কোনো অভিযোগের গুরুত্ব না দিলেও এখন হয়তোবা বিদায়বেলায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে ‘পাপক্ষালনের’ চেষ্টা চলছে! কমিশনের নতুন নির্দেশ হল, ২০টি রাজ্যের বাদ পড়া যোগ্য ভোটাররা নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার সুযোগ পাবেন। একই সুযোগ থাকবে নতুন ভোটারদের জন্যও। এঁদের খুঁজে বের করতে বিএলওরা বাড়ি বাড়ি যাবেন। ‘যোগ্য’ বিচার করতে শেষ কথা বলবেন ইআরও-রা। উলটপুরাণের আরও নমুনা হল, এসআইআর-এ নতুন ভোটারদের নাম তোলার ক্ষেত্রে ফর্ম-৬ পূরণের সময় বাপ-ঠাকুরদার সঙ্গে ‘ম্যাপিং’-এর তথ্য আগে লাগত। এখন বলা হয়েছে, শুধু বয়সের (১৮ বছর) প্রমাণপত্র ও ঠিকানার নথি জমা দিলেই ভোটার তালিকায় নাম তোলা যাবে। কমিশনের এই পরিবর্তিত সিদ্ধান্তই আশাপ্রদ, যা এসআইআর পর্বে অস্বীকার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এসআইআর শুরুর পর যে কয়েকটি রাজ্যে ইতিমধ্যে বিধানসভা ভোট হয়ে গিয়েছে, সেখানে যেসব প্রকৃত নাগরিক ভোটাধিকার হারিয়ে ভোট দিতে পারেননি তাঁদের সেই ন্যায্য অধিকার কী করে ফিরিয়ে দেবে কমিশন? এই পাপের দায় নেবে কে?
কমিশনের নতুন ঘোষণার পরেও পশ্চিমবঙ্গের জটিলতা কাটছে না। এ রাজ্যে তথ্যগত অসংগতির কারণ দেখিয়ে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২২ লক্ষাধিক বাদ পড়া ভোটার পুনরায় নাম তোলার জন্য ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। পাশাপাশি স্বয়ং নির্বাচন কমিশন ১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ট্রাইবুনালে আপিল করেছে। এই প্রেক্ষিতে কমিশনের বক্তব্য, যেহেতু এইসব আবেদন ট্রাইবুনালে বিবেচনাধীন, তাই তাঁরা নাম তোলার জন্য আবেদন করতে পারবেন না। বিরোধীদের বক্তব্য হল, ট্রাইবুনালে যে গতিতে আবেদনের ফয়সালা হচ্ছে তা শেষ করতে এক যুগ সময় লাগবে। এর অর্থ, তথ্যগত অসংগতির আওতায় থাকা এই বিপুল সংখ্যক মানুষ আগামী কয়েক মাসে যেসব পুরসভার ভোট হবে, সেখানকার বাদ পড়া অনেকেই প্রকৃত ‘ভোটার হলেও’ এই অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। তার পরেও আর কত নির্বাচনে এঁরা ন্যায্য ভোটাধিকারের অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন—তা কেউ জানে না। এই অবস্থায় দাবি উঠেছে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। এই যখন পরিস্থিতি তখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের গুণগান করতে শাসকদলের প্রভাবশালীদের কেউ কেউ বলছেন, এ রাজ্যে রক্তপাতহীন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার জন্য তাঁকে পদ্মসম্মানে ভূষিত করা উচিত। বলা বাহুল্য, রক্তপাতহীন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করানোটাই তো কমিশনেরই দায়িত্ব। অথচ কমিশনের একাধিক সিদ্ধান্তের জেরে রাজ্যের বহু মানুষ যে অবর্ণনীয় সমস্যায় জেরবার হয়েছেন, তার দায় কে নেবে? এর পরও কি বিবেক দংশন হবে না? প্রশ্ন হল, জ্ঞানেশ কুমারকে আড়াল করতে শাসক দলের প্রভাবশালীরা কি এখনও তাঁর পাশে থাকার সাহস দেখাবেন? নাকি হাত ধুয়ে ‘ক্লিন’ থাকার চেষ্টা করবেন?