বিমল বন্দ্যোপাধ্যায়, বজবজ: মহেশতলার নুঙ্গি মৌজার এক সময়ের জমিদার ছিলেন উদয়নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়। গঙ্গা থেকে দেড় কিলোমিটার তফাতে নুঙ্গি অঞ্চলে হেতাল, সুন্দর, গরানের ঘন জঙ্গল। সুন্দরবনের এই তল্লাটে তখন বসত হাতে গোনা মানুষের। সানি পাড়া, মেটে পাড়া আর জেলে পাড়া। রেললাইন তখন হয়নি। মাটির রাস্তা চারদিকে। উদয়নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় বাড়ি তৈরির পাশাপাশি দুর্গাপুজোর জন্য আলাদা ঠাকুরদালান গড়লেন। যদিও তা শুরু করতে পারেননি। দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল তাঁর ছেলে জমিদার শিবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। বৈষ্ণব মতে। তার বয়স প্রায় আড়াইশো বছর।
জমিদার বাড়ির পুজো জমজমাট। ঠাকুরদালানে প্রতিমা তৈরির জন্য গরান কাঠের কাঠামোতে পটশিল্পী এসে প্রতিমা তৈরি করতেন। পুজোর ক’দিন চোখ ধাঁধানো ১০৮ প্রদীপের ঝাড়বাতি জ্বালানো হত। বাড়ির চারপাশজুড়ে বড়ো বড়ো লন্ঠন জ্বলত। ঢাকি আসত এক ডজন। পুজো ও ভোগ দেওয়ার জন্য একাধিক বড়ো তামার তালা, শ্বেতপাথরের নানা আকারের বাটি ছিল। ছিল ভোগ রান্নার আলাদা ঘর। বাড়ির মহিলারা ঘোমটা দিয়ে ভোগ রান্না করতেন। সেসময় কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। জমিদার পরিবারের আড়াইশো সদস্য পুজোয় অংশ নিত। জমিদারদের অনেকের গাদা বন্দুক ছিল। এছাড়া ছিল লেঠেল বাহিনী। সন্ধিপুজোর দিন গান ফায়ারিং হত। তারপর হত লাঠিখেলা। লেঠেলরা পালা করে খেলা দেখাতেন। আড়াইশো বছর পর এখন আর জমিদারি নেই। বিশাল এলাকা নিয়ে বাড়িটি রয়েছে। চট্টোপাধ্যায় বাড়ির সপ্তম পুরুষ ৬২ বছরের শোভন চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমার ঠাকুরদার সময় পর্যন্ত জমিদারি ছিল। বাবা সুশীল চট্টোপাধ্যায়ের মুখে শুনেছি, তিনি অল্প বয়সে পুজোর সব ট্রাডিশন পালন হতে দেখেছেন। তখনও গান ফায়ার থেকে লাঠি খেলা হয়েছে। আমার ছোটবেলা পর্যন্ত আড়াইশো সদস্য পুজোয় আসত। জাঁকজমক ছিল। এখন অনেকে মারা গিয়েছেন। সবমিলিয়ে ৫০ সদস্য হাতে গুনে পাওয়া যায়। বাড়িতে বহু ঘর তালাবন্ধ। এখন পুজোর সময়ও অনেকে আসতে পারেন না। আগের সময়ের তামার তালা, শ্বেতপাথরের বাটি সব চুরি হয়ে গিয়েছে। নতুন থালা ও বাটি কিনে আনা হয়েছে। এখন আর ঝাড়বাতি জ্বলে না। বদলে পিতলের বড় প্রদীপ জ্বালানো হয়। প্রতিদিন ভোগ রান্না হয়। মায়ের পুজো নিয়ম ও নিষ্ঠা সহকারে হয়। এবারও তার অন্যথা হচ্ছে না। ঠাকুরদালানে মূর্তির কাজ প্রায় শেষ। একটা জিনিস আড়াইশো বছর ধরে এখনও চলে আসছে। তা হল উমা বিদায়ের দিন তাঁকে পান্তা ভাত আর কচুর শাক খেতে দেওয়া হয়। কারণ উমা বা দুর্গাকে আমরা বাড়ির মেয়ে বলে মনে করি। বলা হয়, পুজোর ক’দিন মা নানা ধরনের ভালো খাবার খেয়েছেন। তাই যাওয়ার সময় যাতে তিনি সুস্থ শরীরে যেতে পারেন এ জন্য পান্তা আর কচুর শাক দেওয়া হয়। বাড়ির সকলে সেই প্রসাদ পান।



