সঞ্জয় গঙ্গোপাধ্যায়, বারাকপুর: সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শহর নৈহাটির মিত্রপাড়ায় ভট্টাচার্য বাড়িতে দেবী দুর্গা পুজিত হন কার্তিক, গণেশ ছাড়াই। মায়ের স্বপ্নাদেশেই কার্তিক, গণেশের কোনও পুজো হয় না। পুজো হয় মা দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর। তবে লক্ষ্মী-সরস্বতীর কোনো বাহন থাকে না। তারা মা দুর্গার কন্যা সন্তান নয়, এখানে বান্ধবী জয়া, বিজয়া রূপে পুজিত হন। মা দুর্গার বাহন সিংহর রূপও ভিন্ন। নরসিংহ রূপে রয়েছে এই সিংহ। এই বাড়ির এবারের পুজোর বয়স ৩২৪ বছর। মায়ের রং এখানে অতসী ফুলের মতো। অসুরের রং গাঢ় সবুজ। এক চালার কাঠামোতেই মায়ের পূজো হয়। মায়ের চোখ আঁকার পর থেকে যতক্ষণ বিসর্জন না হয়, এই বাড়িতে আমিষ রান্না হয় না।
এই পুজো শুরু করেছিলেন হরিনাথ ভট্টাচার্য। এই বাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে নানা ধরনের সব অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়। কেন কার্তিক, গণেশ পুজিত হন না, তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই বাড়ির অন্যতম কর্তা মানস ভট্টাচার্য বলেন, ৩০০ বছর আগে সন্ধি পূজার সময় আমাদের বাড়ির দুই বালক বারংবার নিষেধ করা সত্ত্বেও দুষ্টুমি করছিল। তা দেখে মা অসন্তুষ্ট হন। তখন মা ছিলেন উগ্রচণ্ডী রূপে। তখন মা ওই দুই বালককে গ্রাস করে নিয়েছিলেন। রাতে পুজোর পুরোহিতকে স্বপ্নাদেশে তিনি বলেন, ওই দুই বালককে আমি গ্রাস করেছি। বেদীতলে দেখ, ওদের জামাকাপড় রয়েছে। পুরোহিত ছুটে এসে দেখেন, মায়ের মুখে রক্তের দাগ, বালকরা যে ধুতি পরেছিল, সেই ধুতির টুকরো রয়েছে মায়ের মুখে। জামাকাপড় পড়ে রয়েছে নীচে। মা তখন নির্দেশ দেন, তোমাদের বাড়ির দুই ছেলেকে যখন আমি গ্রাস করেছি, তখন আমার পুজোর সময় আমার দুই ছেলে কার্তিক, গণেশ আর আসবে না। সেই থেকে এই বাড়িতে কার্তিক গণেশের পুজো হয় না।
নৈহাটির ভট্টাচার্য বাড়িতে পুজো নিয়ে বহু মানুষের আকর্ষণও রয়েছে। আজ, শুক্রবার ষষ্ঠীতে বোধন দিয়ে পুজো শুরু হবে। সপ্তমী বাড়িতেই নবপত্রিকা স্নান হয়। সকলেই প্রতিমা দেখতে আসেন, মাকে পুজো দেন। অষ্টমীর দিন খুবই ভিড় হয়। অনেকে মায়ের কাছে মানত করেন।
ভট্টাচার্য বাড়ির সপ্তমীর দিন সাত পদ, অষ্টমীর দিন আট পদ, নবমীর দিন নয় পদ ভোগ দেওয়া হয়। পুজোতে মাকে খিচুড়ি, পোলাও সহ নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। দেওয়া হয় পাঁচ রকম ভাজা, নানা ধরনের সবজি, চাটনি, মিষ্টান্ন। কোনরকম আমিষ ভোগ হয় না। দশমীতে দেওয়া হয় পান্তা এবং কচু শাক। একবার এই ভোগ রান্না করতে গিয়ে বাধা পড়েছিল। সেই থেকে পাশের বাড়ি থেকে রান্না করিয়ে নিয়ে এসে মাকে দেওয়া হয়।
পুজোর সময়ে পরিবারের লোকেরা দূরদূরান্ত থেকে হাজির হন ভট্টাচার্য বাড়িতে। এখানে দেবী ঘটে পুজো হয় না। জালা আকৃতির ঘটে পুজো হয়।



