সৌম্যজিৎ সাহা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ‘পাগ মার্কস’ বা পায়ের ছাপ দেখে হেঁটে ট্র্যাকিং। চার জায়গায় টোপ। বন আধিকারিক ও কর্মীদের বিনিদ্র রাত কাটানো। দিনরাত এক করে অপেক্ষা। অবশেষে মোষ মেরে অর্ধেক খেয়ে চলে গিয়ে ফের সেই শিকারের কাছে এসে বিশ্রাম নিতেই কেল্লা ফতে! বাঘ ধরার অভিযানে নিযুক্ত দলের ছোড়া ঘুম পাড়ানি গুলিতে কাবু হল বাঘিনি। ‘টি ১৩৮’ নামেই সে পরিচিত। এই গোটা অভিযান পর্ব ছিল রোমাঞ্চ ভরা ও রোমহর্ষক। ৩৩৬ ঘণ্টার পরিশ্রমে ধরা পড়ল উত্তরবঙ্গের রানি। ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি, বক্সা টাইগার রিজার্ভের বাছাই করা কয়েকজন অফিসার, সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের ডাক্তার ও অফিসারসহ কিছু বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত একটি দলকে পাঠানো হয় বিহারের বাল্মীকি অভয়ারণ্যে। দলটি সেখানে পৌঁছানোর পর প্রথমেই ঠিক করে কোন বাঘিনিকে তারা ধরবে। সেইমতো তিনটি বাঘিনিকে বাছাই করা হয়। তারপর ট্র্যাপ ক্যামেরার ছবি, ভিডিয়ো দেখে ‘টি ১৩৮’-কে চূড়ান্ত করে ফেলেন এই দলের সদস্যরা। তার মুভমেন্ট, দিনযাপন প্রভৃতি দেখেই পছন্দ হয় দলের। এরপর তাকে ধরার অভিযান শুরু হয়। প্রথমেই বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভের অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে ১৪ জনের একটি দল গঠিত হয়। তাতে ওই রিজার্ভের লোকজন ছাড়াও শামিল করা হয় রাজ্যের কয়েকজন অফিসার ও বনকর্মীকেও। শুরু হয় সেই বাঘিনিকে ট্র্যাক করার কাজ।
বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ২০-২৫ বর্গ কিমি জুড়ে ‘টি ১৩৮’ বিচরণ করে। এটাই তার এলাকা। সেইমতো ওই এলাকায় বাঘিনির পায়ের ছাপ অনুসরণ করে ১৪ জন লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তার খোঁজে। খাল-বিল, ঘন জঙ্গল যেখানে যেখানে পায়ের ছাপ দেখা গিয়েছে সবটা হেঁটে ঘুরে ফেলেন ওই দলের সদস্যরা। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় তাকে ‘লোকেট’ করা যায়নি। দু-তিন ধরে চলে এই কর্মসূচি। তার মধ্যে ভারী বৃষ্টিতে কাজ ব্যাহত হয়। তবুও হাল ছাড়তে চাননি অফিসাররা। বৃষ্টি থামতেই ফের শুরু হয় বাঘিনি ধরার অভিযান।
সূত্রের খবর, এরপর ঠিক হয়, জীবন্ত গবাদি পশু দিয়েই বাঘিনিকে প্রলোভন দেখাতে হবে। জঙ্গলের চার জায়গায় গাছের সঙ্গে বাঁধা হয় গোরু ও মোষের বাচ্চা। তার আগে বিভিন্ন স্থানে মাচা বেঁধে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছিল। বাঘিনি কোনো শিকার করে কি না তার অপেক্ষা শুরু হয়। এভাবে তিনদিন কেটে যায়। দিনরাত জেগে বসে থাকেন বাঘ ধরার দলের সদস্যরা। অবশেষে রবিবার একটি শিকার করে সে। সেই খবর পেতেই সতর্ক হয়ে যান প্রত্যেকে। শিকার অর্ধেক খেয়ে আবার নিজের এলাকায় ‘টহল’ দিতে বেরিয়ে পড়ে বাঘিনিটি। আবারও শুরু হয় বিনিদ্র অপেক্ষা। শেষমেশ মঙ্গলবার ঘুরে ফিরে সেই শিকারেরই কাছে এসে বিশ্রাম নিতে বসে পড়ে ডোরাকাটা প্রাণীটি।
এটি ওই টাইগার রিজার্ভের মঙ্গুরাহা রেঞ্জের ৭০ নম্বর কম্পার্টমেন্ট। আগেই শিকারের জায়গা থেকে খানিকটা দূরে গাছে মাচায় অপেক্ষা করছিলেন অফিসাররা। এবারে যেন একবারে হাতের মুঠোয় এসে গিয়েছে ‘টি ১৩৮’। সবুজসংকেত পেতেই এক কর্মী ঘুম পাড়ানি গুলি চালান। বাঘিনির পেটে লাগে সেটি। কিছুক্ষণের জন্য নিস্তেজ হয়ে পড়ে তিনবছর বয়সি সেই বাঘিনি। এরপর তাকে উদ্ধার করে আনা হয়। রেডিয়ো কলার পরিয়ে যাবতীয় কার্যক্রম সেরে ওই জঙ্গল থেকে হেলিকপ্টারে করে গোরখপুর নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে ছিলেন অফিসার ও ডাক্তার মিলিয়ে সাতজন। এরপর এদিন ভোরে ‘টি ১৩৮’ এসে পৌঁছায় আলিপুর দুয়ারে। ২ অক্টোবর থেকে বক্সা হতে চলেছে তার নতুন ডেরা।