রামকুমার আচার্য, আরামবাগ: পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। ধবধবে সাদা কাশফুলে ঢাকা মাঠ-ঘাট। প্রকৃতি জানান দেয় আগমনীর। মহালয়ার ভোর সেই আগমনীর আবেগ। বেতার যন্ত্র রেডিওতে ভেসে আসে আকাশবাণীর অক্ষয় অমর ঘোষণা—আশ্বিনের শারদ প্রাতে...। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনীর এই গীতি আলেখ্য আজও গোটা বাঙালি জাতিকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। কিন্তু এখন ক’জন আর শোনেন রেডিওর সেই অনুষ্ঠান! সময়ের কালগর্ভে রেডিও নামক যন্ত্রটি কার্যত বিলুপ্ত হতে বসেছে। স্মার্টফোন, হাইস্পিড ইন্টারনেটের যুগে এখন যখন খুশি শোনা যায় মহিষাসুরমর্দিনী। তবু মহালয়ার আগে রেডিও সারাতে বসলে নস্টালজিয়ায় ডুবে যান আরামবাগের ৭৪ বছরের শেখ আরশেদ আলি। রেডিওতে প্রাণসঞ্চার করে ফিরে যান নিজের সেই তরতাজা তরুণ বয়সে।
আরশেদ তখন একুশের তরুণ। কর্মজীবন শুরু করেন রেডিও সারানোর মিস্ত্রি হিসেবে। মহালয়া এলেই নাওয়া তিনি খাওয়া ভুলে যেতেন। রাতদিন কাটাতেন দোকানে। তখন কাঠের বাক্সে তৈরি ট্রানজিস্টারের প্রচলন ছিল বেশি। পরে এল প্ল্যাস্টিকের কাঠামো। আরশেদের দোকানো থরে থারে সাজানো থাকত রেডিও। সেগুলি সারানোর মধ্যে আলাদা তৃপ্তিও পেতেন তিনি। আরামবাগের হরিণখোলা ১ পঞ্চায়েতের শাহবাগের বাসিন্দা আরশেদ। জীবনের প্রথম দিকে কাঠ মিস্ত্রি ছিলেন। পরে অবশ্য রেডিও, সাদা কালো টিভি, টর্চ, লাইট প্রভৃতি সারানোর কাজ শুরু করেন। আরামবাগ শহরের তালতলা বাজার এলাকায় ৫০ বছরের পুরনো একটি দোকানেই এখনও সেই কাজ করে চলেছেন। রেডিও বিদায় নিলেও তিনি বিদায় দেননি রেডিওকে।
সপ্তাহ খানেক আগে আরশাদের দোকানে এসেছে কয়েকটি রেডিও। সেগুলি পেয়েই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। শুক্রবার বিকেলের মধ্যেই ডেলিভারি দিতে হবে সবক’টির। সেগুলি সারাতে সারাতে আরশেদ সাহেব ডুব দিলেন ফেলে আসা স্মৃতিতে। বলছিলেন, ‘সে একটা সময় ছিল ভাই। মহালয়ার আগে রেডিও সারানোর ব্যস্ততা ছিল চূড়ান্ত। দোকান খোলার আগে থেকে লাইন দিয়ে রেডিওর শ্রোতারা ভিড় জমাতেন। এখন সেই ভিড় অতীত। এখন রেডিও সারাইয়ের যন্ত্রাংশও আর বাজারে সবসময় পাওয়া যায় না। আগে থেকে অর্ডার দিতে হয়। এবার কয়েকদিনে পাঁচ-ছয়টি রেডিও এসেছে। মহালয়ার আগে সেগুলি সারিয়ে দেব। আগের মতো রেডিওর সুদিন আবার ফিরলে ভালো লাগবে।’



