দেশজুড়ে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগের কাঠগড়ায় ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর ইস্তফার দাবিতে শনিবার থেকে দিল্লির যন্তরমন্তরে মেগা আন্দোলনের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। জেন জি’র এই আন্দোলন শুরুতেই ভেস্তে দিয়ে জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে রাজধানী শহরকে যে দুর্ভেদ্য দুর্গের চেহারা দেওয়া হয়েছে এক কথায় তা অভূতপূর্ব তো বটেই, নজিরবিহীনও। ভাবতে অবাক লাগে, স্বাধীন দেশে এও সম্ভব! গত জুলাই মাসে জেন জি’র এমনই এক মরণপণ আন্দোলনের ডাকে নাকানিচোবানি খেতে হয়েছিল কেন্দ্রের প্রশাসনকে। সেই আন্দোলনের চাপে ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। এবার তাই জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে যন্তরমন্তরের আন্দোলনকে গোড়াতেই খতম করতে নীতিনৈতিকতা জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিরোধের প্রায় সব শক্তি নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মোদি সরকার। খোদ সরকারি উদ্যোগে নাগরিক স্বার্থরক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে দিল্লি শহরকে করে ফেলা হল যেন এক যুদ্ধাঙ্গন! প্রায় ৫০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, কাশ্মীর ও ছত্তিশগড় থেকে ২৩ কোম্পানি আধাসেনাকে উড়িয়ে আনা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের আটক করে রাখতে ৩১টি অস্থায়ী কেন্দ্র প্রস্তুত রাখাও হল! দিল্লি সীমানায় নয়ডা, গুরুগ্রাম ও ফরিদাবাদ থেকে শহরে ঢোকার সব প্রবেশ ও প্রস্থান পথে চলল নাকাতল্লাশি। শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত বন্ধ ৫৭টি মেট্রো স্টেশন। অন্তত ২৫০টি ট্রেন (এর মধ্যে রাজধানীসহ ৭৫টি মেল- এক্সপ্রেস ট্রেন) নাকি দিল্লি ঢুকবে না রবিবার পর্যন্ত! সেন্ট্রাল দিল্লিতে যাতায়াতকারী বাস পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ বাজার-দোকান। সেন্ট্রাল দিল্লির সব হোটেলেও পড়েছে তালা। বন্ধ ইন্টারনেট পরিষেবা। রাস্তায় যে গার্ড রেল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে, তাও পেরেক দিয়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়েছে। মোদি জমানায় এ যেন এক ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’! করোনা পর্বে লকডাউনের সময়েও এ হেন পরিস্থিতি দেখেনি দেশবাসী। এ ছবি জেন জি-র আন্দোলন শুরুর আগের। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, আতঙ্কে শাসক। তাহলে কি দেশের তরুণ প্রজন্মকে ভয় পাচ্ছে দেশের সরকার? না হলে কেন নেওয়া হবে এধরনের উদ্যোগ?
শনিবার বেলা ১২টায় আন্দোলন শুরুর আগেই ভোরের আলো ফুটতেই অ্যাকশনে নামে প্রশাসন। ককরোচ জনতা পার্টির তিন প্রধান নেতাকে দিল্লি ঢোকার মুখে বিমানের মধ্যেই আটক করা হয়। বিমানের মধ্যে পুলিশের এমনভাবে ঢুকে পড়ার ঘটনাও নজিরবিহীন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া আটকাতে বাম ও বিরোধী দলের এবং আপ-এর নেতৃত্বকে কাউকে বাড়ি, অফিস বা পথেই আটক করা হয়েছে। ধরপাকড় হয়েছেন বহু। যা ইন্দিরা জমানায় কুখ্যাত জরুরি অবস্থাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষা করতে কেন্দ্রের এই মারমুখী মনোভাব দেখে অনেকে ‘কান টানলে মাথা আসার’ তত্ত্বকে সামনে আনছেন। রাজধানীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে জ্ঞানেশ কুমার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিশেষ প্রিয়পাত্র হিসাবেই খ্যাত। সেই কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও স্নেহধন্য। সরকারের এই দুই শীর্ষ নেতার যৌথ সিদ্ধান্তেই যে জ্ঞানেশ কুমারের নির্বাচন কমিশনারের পদ প্রাপ্তি তা নিয়ে অনেকের মনেই কোনো সন্দেহ নেই। স্বভাবতই তড়িঘড়ি এসআইআর করে বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিয়ে ‘গুরুদক্ষিণা’ দিয়েছেন জ্ঞানেশ— এমন অভিযোগ বিরোধীদের। আরও অভিযোগ, বহু প্রকৃত ভোটারকে বাদ দেওয়ার কৌশলের ‘মাস্টারমাইন্ড’ আসলে সরকারেরই দুই শীর্ষকর্তা, এমনটা মনে করেন অনেকে। এই অবস্থায় ধর্মেন্দ্র প্রধানের পর জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা দিতে বাধ্য হলে ককরোচ ও বিরোধীদের পরের টার্গেট হতে পারেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শেষে প্রধানমন্ত্রী। এই আশঙ্কাতেই হয়তো জ্ঞানেশকে বাঁচাতে মরিয়া প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে কেন্দ্র। যা দেখে অনেকেই একে ‘যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
‘ভয় পেয়েছেন মোদি-শাহরা’— বলছেন জেন-জির নেতৃত্ব। এই আত্মবিশ্বাস তাঁদের চোখে-মুখে। এমন অপ্রতিরোধ্য নিরাপত্তার বেড়াজাল দেখেশুনেও তাঁরা হাসছেন, তীব্র শ্লেষ আর কটাক্ষ ছুড়ে দিচ্ছেন। কারও মতে, তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন দমনে সরকারি উদ্যোগে এমন ‘জরুরি অবস্থা’ জারি, যা ইন্দিরা গান্ধীও করেননি। আবার কারও মতে, সরকারি মদতে এ হল অঘোষিত বন্ধ। আন্দোলন শুরুর আগেই ধরপাকড় করে জেন জি-র মনোবল ভেঙে দেওয়ার সরকারি চেষ্টা হলেও কেন্দ্রের উদ্দেশ্য যে সফল হবে না, সে কথা বোঝাতে আইসা নেত্রী নেহা বোরা ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের উদাহরণ টেনে বলেছেন, তখনও স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের গৃহবন্দি করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও আন্দোলন দমন করা যায়নি। ইংরেজ ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। শাসকের দমনপীড়নের এমন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নেহার বার্তা, ‘যেখানে আটকাবে, সেখানেই বসে পড়বেন।’ সেটাই হবে যন্তরমন্তর। এই দুঃসহ স্পর্ধা আটকাতে কোনো প্রতিরোধই কি যথেষ্ট? প্রশাসনিক শক্তিকে ব্যবহার করে দুর্ভেদ্য দুর্গ বানিয়ে সত্যিই কি রোখা যাবে দেশের তরুণ প্রজন্মকে? ইতিহাস সাক্ষী, স্বৈরাচারী শাসকের পতন অনিবার্য। দেশ শাসকের তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।



