গত শুক্রবার থেকে রবিবার, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দু’বার। দেশের মানুষ দেখল, যন্তরমন্তরকে কেন্দ্র করে ককরোচদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ঠেকাতে প্রশাসনের তরফ থেকে দিল্লিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, রাজধানীর স্বাভাবিক জনজীবন কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হলেও পুরোপুরি বিধিনিষেধ আরোপ করা চলবে না। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, মাছি মারতে কেউ হাতুড়ি চালায় না। সেই নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শনিবার আন্দোলন শুরুর প্রথম দিন দিল্লির পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী দিনভর রাজপথে ‘তাণ্ডব’ চালিয়েছে দেখে সেই সুপ্রিম কোর্টেই আদালত অবমাননার মামলা দায়ের হয়েছিল। রবিবার ছুটির সকালে শীর্ষ আদালত আরও সুনির্দিষ্ট করে নির্দেশ দেয়, রাস্তায় লোহার ব্যারিকেড সরাতে হবে। নিরস্ত্র নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ জমায়েতে বাধা দেওয়া যাবে না। স্বাভাবিক করতে হবে রেল ও মেট্রো পরিষেবা, চালু করতে হবে ইন্টারনেটও। সাধারণ মানুষের যাতায়াতে অহেতুক বাধাদান চলবে না। নিয়ম মেনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলে কাউকে আটক করা যাবে না। আদালত চত্বরের আশপাশ থেকে ১৬৩ ধারা জারি সংক্রান্ত বোর্ড সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রশ্ন হল, আদালতে সমালোচিত হওয়ার পরও কি বোধোদয় হয়েছে দিল্লি পুলিশের বা কেন্দ্রের সরকারের?
এদেশে এখনও সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষায় আদালতের নির্দেশকেই চূড়ান্ত মনে করা হয়। কিন্তু রবিবার সকালে সর্বোচ্চ আদালতের একগুচ্ছ নির্দেশিকার পরেও ছুটির সারাদিন যে ছবি দেখা গিয়েছে রাজধানীর রাস্তায়, তাতে আবারও প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। শনিবারের মতোই চিত্রনাট্য এক রেখে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত দফায় দফায় আন্দোলনকারীদের আটক করা, মারধর করা, মহিলাদের উপর পুরুষ পুলিশের দমনপীড়ন নীতি—সবই চলেছে নির্বিচারে। দিল্লি পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাননি জনপ্রতিনিধিরাও। সিপিএমের এক সাংসদকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছে। সেই একই চিত্র! বেপরোয়া অমানবিক আচরণ পুলিশের! দেখা গেল, কোনো একজন প্রতিবাদীকে রাস্তা থেকে টেনে হিঁচড়ে বাসে তুলছেন কয়েকজন পুলিশ! রবিবার রাস্তায় প্রতিবাদীদের আটক করতে যে বাস আনা হয়েছিল, তাও বেশ অভিনব। প্রতিটি বাসের মধ্যে লোহার তারকাঠি দিয়ে ছোটো ছোটো ‘সেল’ তৈরি করা হয়েছে। অনেকটা জেলখানার আদলে। একটি সেলে একাধিক প্রতিবাদীকে রাখায় দমবন্ধ পরিস্থিতি। সাধারণ জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদীদের আটক করে নিয়ে যেতে নিরাপত্তার স্বার্থে এমন গাড়ি ব্যবহার করা হয়—বলছেন অভিজ্ঞজনেরা। আদালতের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে রবিবারও একাধিক জায়গায় বন্ধ ছিল মেট্রো স্টেশন। ইন্টারনেটও চালু হয়নি বহু জায়গায়। অভিযোগ, পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনীর এই যৌথ তাণ্ডবে রবিবার রাজধানীর একাধিক জায়গায় দোসর হতে নাকি দেখা গিয়েছে আরএসএস-বজরঙ দলের মারমুখী কিছু কর্মীকে। শনিবার এমন কিছু বীরপুঙ্গবের হামলার একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় অভিযুক্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু রবিবার দেখা গেল, জেন জি থেকে সাংবাদিক—শাসকের মদতপুষ্ট দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রেহাই মেলেনি আন্দোলনকারীদের। ‘আরশোলা’দের আরও শায়েস্তা করার হুমকি শোনা গিয়েছে এদের মুখে। স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের দেশবাসী আবারও দেখল বিরোধীস্বর দমনের কী আপ্রাণ চেষ্টা! এর নাম বোধহয় মোদি জমানার ‘গণতন্ত্র’!
আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তা অগ্রাহ্য করে পুলিশ-প্রশাসন যত আন্দোলন দমনে তীব্র আক্রমণাত্মক হয়েছে, আন্দোলন-বিক্ষোভ তত ছড়িয়ে পড়ছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা না হওয়া পর্যন্ত জারি থাকা আন্দোলন দিল্লির সীমানা পেরিয়ে শুধু এ দেশের বিভিন্ন শহরেই নয়, এতে সংহতি জানিয়ে পথে নেমেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্রছাত্রীরা। নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, ঢাকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের একাধিক শহরে রবিবার দেখা গিয়েছে পথে নেমে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন সেখানকার ভারতীয় পড়ুয়ারা। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের অন্যতম মুখপাত্রর উদ্বেগ প্রকাশ ভারত সরকারের ভূমিকাকে যেন আরও বেআব্রু করে তুলেছে। এই আন্তর্জাতিক সংগঠনটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষায় যথেচ্ছ আটক হওয়া পড়ুয়াদের মুক্তির দাবিতে সরব হয়েছে। যদিও লজ্জা ঢাকতে মোদি সরকার একে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ বলে যাবতীয় অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের এই মতামত ‘চরম পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে মনে করে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। কিন্তু প্রশ্ন হল, আন্দোলনকারীর উপর এমন দমনপীড়নের ঘটনার জেরে কী বার্তা যাচ্ছে বিদেশে পাঠরত ভারতীয় পড়ুয়াদের কাছে? সরকার যাই বলুক বরং এই মতই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে, দিল্লিতে পুলিশ-প্রশাসনের দমনপীড়ন আসলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা মাত্র। সেই চেষ্টাতেও ব্যর্থ সরকার। লজ্জার কথা হল, রাষ্ট্রের এই দমন নীতি রবিবার সর্বোচ্চ আদালতের সামনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও মোদি-শাহ বাহিনীর ঔদ্ধত্য কমার কোনো লক্ষণ নেই! সরকারের মুখ পুড়লেও উলটে জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। এটা স্বেচ্ছাচারেরই লক্ষণ। গণতন্ত্রের পক্ষে সমূহ বিপদের।



