পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: মাথার ওপর আশ্বিনের চড়া রোদ। সেই রোদে পুড়ে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছেন এক বৃদ্ধ। চুল-দাড়ি পেকেছে সেই কবেই। পরণে সাদা মলিন ফতুয়া, গলায় গামছা, আর কাঁধে সযত্নে রাখা একটা গোটানো পটচিত্র। একের পর এক বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ সাড়াই দিচ্ছেন না! কেউ ভিখারি ভেবে হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বিদায় করছেন। তবে এর মাঝেই কেউ পরম আদরে ডেকে নিচ্ছেন বাড়ির ভেতরে। আর তখনই শিল্পীর কদর পাওয়ার আনন্দে চোখের কোণ চিকচিক করে উঠছে বৃদ্ধ লাল্টু চিত্রকরের। পরম মমতায় কাঁধের পাকানো পটচিত্র বের করে দেখাতে থাকেন। গান গেয়ে শোনান মহিষাসুরমর্দিনীর আখ্যান। নিমেষে ভুলে যান চড়া রোদের ক্লান্তি।
বীরভূমের ইটাগড়িয়ার বাসিন্দা লাল্টু চিত্রকর জাতিতে মুসলিম। তবুও পুজো এলেই সবার আগে ডাক পড়ে তাঁরই। এখন দম ফেলার ফুরসৎ নেই তাঁর। পটচিত্র দিয়ে মণ্ডপের থিম সাজাতে প্রতিবারের মতো এবারও বরাত পেয়েছেন তিনি। নবমীর দিন সাঁইথিয়ায় একটি মণ্ডপে পাঁচটি পটের গান গাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। দশমীর দিন আবার সিউড়ির কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে শোনাবেন ‘শিবের শাঁখারি বেশ’ পালা। অভিমানিনী উমা বাপের বাড়ি চলে এলে, মহাদেব কীভাবে শাঁখারির ছদ্মবেশে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন, সেই মধুর আখ্যানই পটে দেখিয়ে নিজের সুরে গাইবেন। তাছাড়া, এই পুজোর কয়েকটা দিন বাকি। এখন গ্রাম থেকে শহর ঘুরে শোনাতে হবে পটের গান। তাই ব্যস্ততার সীমা নেই লাল্টু চিত্রকরের। তিনি ছাড়া আর কেই বা শোনাবেন এসব!
তাঁর গ্রাম ইটাগড়িয়ায় অন্তত ৮০টি পটুয়া বা চিত্রকর পরিবারের বাস ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অভাবের তাড়নায় একে একে পেশা বদল করেছেন গ্রামের সবাই। কেউ রঙের মিস্ত্রি, কেউ বা জনমজুরি করে দিন গুজরান করছেন। হাতে গোনা যে দু’-চারজন প্রাচীন এই শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ এই লাল্টুই। বাপ-ঠাকুরদার রক্তে মিশে থাকা ঐতিহ্য তিনি কিছুতেই হারিয়ে যেতে দিতে নারাজ। তাই পুজোর সময় লোকের দুয়ারে, আর বছরের বাকি সময়টা কাটে বোলপুরের সৃজনী শিল্পগ্রামে। অবশ্য, বিশেষ বিশেষ উত্সবের দিনে ডাক পড়ে তাঁর। ভাদ্রে মনসামঙ্গল, চৈত্র-বৈশাখে চৈতন্য মহাপ্রভুর নাম সংকীর্তন, রাসে কৃষ্ণলীলা কিংবা জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে রামচন্দ্রের পালাগান তিনি শোনান পরম যত্নে।
একদিকে মুসলিম পরিচয়, অন্যদিকে দিনরাত হিন্দু পুরাণের দেবদেবীদের নিয়ে তাঁর যাপন। এই আশ্চর্য মেলবন্ধন প্রসঙ্গে প্রশ্ন শুনে হাসিমুখে বৃদ্ধ বলেন, ‘কিন্তু শিল্পের কি কোনো জাত-ধর্ম আছে? আমাদের শিল্পীদের কোনো ধর্ম নেই। আমার শিল্পই আমার ধর্ম। আমরা মানুষ, এটুকুই।’
রোদটা চড়ছে আরও। আজ আরও কয়েকটা বাড়িতে যাওয়ার তাগিদ রয়েছে বৃদ্ধের। তাই গামছায় মুখের ঘাম মুছে ফের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নেন। ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করেন। একটু একটু করে দূরে মিলিয়ে যেতে থাকে লাল্টু পটুয়ার অবয়বটা। আর তাঁর ওই ক্রমশ ছোট হয়ে আসা ছায়াটা যেন সমাজের বুকে এক নীরব বার্তা রেখে যায়— শিল্পের উঠোনে ঈশ্বর আর আল্লা আজও নিশ্চিন্তে পাশাপাশি বসে থাকেন।



