সংবাদদাতা, বিষ্ণুপুর: অন্তিমকালে সেবা শুশ্রুষা করে শ্রীরামপুরের নীলকর সাহেবের মন জয় করেছিলেন। তাই মৃত্যুর আগে নীলকরের কাছ থেকে পাওয়া ধনরত্ন দিয়েই বিষ্ণুপুরের অযোধ্যায় জমিদারি স্থাপিত হয়েছিল। প্রচুর ধনসম্পত্তি থাকলেও গ্রামের সর্বজনীন পুজো দেখতে গিয়ে ভিড়ের মাঝে জমিদার গিন্নি দেবীদুর্গার আরাধনা করতে পারেননি। সেই আক্ষেপ থেকেই বাড়িতে পুজোর প্রচলন হয়েছিল। এখন সেই জমিদারি নেই। অর্থের প্রাচুর্যও নেই। জৌলুস কমলেও জমিদারবাড়ির পুজোয় ঐতিহ্য আজও অমলিন।
২০০ বছর আগে অযোধ্যার জমিদার বাড়িতে যে পুজোর প্রচলন হয়েছিল। আজও একই রীতি নীতি মেনে চলে আসছে। পুজোয় দেশ বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা যেমন আসেন। তেমনই অযোধ্যা সহ আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের দর্শনার্থীরা মণ্ডপে ভিড় জমান। তৎকালীন জমিদারের তৈরি ঠাকুরদালান, নাটমন্দির, রাসমঞ্চ আজও অক্ষত রয়েছে। তবে সেই কাছারি বাড়ি ধ্বংসের মুখে। সব মিলিয়ে জমিদার বাড়ির বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা ট্রাস্ট গড়ে মিলে মিশে পুজোর আয়োজন করেন। ট্রাস্টের অধীনে যেটুকু জমিজমা রয়েছে, তার আয় থেকে পুজোর খরচ চালান।
জমিদার বাড়ির বর্তমান সদস্য মনোহর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আগে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের তোপধ্বনি শুনে সন্ধিপুজো হত। এখন পঞ্জিকার সময় অনুযায়ী তা হয়। পুজোয় চাল কুমড়ো বলি হয়। এখনো রুপোর পালকিতে করে এবং রুপোর ঘটে নবপত্রিকা আনা হয়। আগে পুজোয় দিনের বেলায় যাত্রা হত। এখন তা হয় না। তবে পুজোর রীতি ও আচার একই আছে। গ্রামের পাশে দহ থেকে ঘটের জল এনে পুজো শুরু করা হয়। পুজোর সময় অযোধ্যা ছাড়াও আশেপাশের গ্রাম থেকেও বহু দর্শনার্থী আসেন। পরিবারের সদস্যরা কর্মসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় থাকেন। তাঁরাও পুজোর সময় আসেন। সব মিলিয়ে পুজোর ক’টা দিন হই হুল্লোড় করে কেটে যায়।
অযোধ্যার জমিদার বাড়ির পুজোর প্রচলন হয় ১৮২৪সালে। তার আগে বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের পূর্বপুরুষ রামমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীরামপুরে এক নীলকর সাহেবের বাড়িতে কাজ করতেন। অন্তিমকালে সেবা শুশ্রুষা করায় মৃত্যুশয্যায় থাকা সাহেব তাঁকে প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে যান। ওই ধনরত্ন তিনি অযোধ্যার বাড়িতে পাঠান। তখন অযোধ্যায় তাঁর তিন ভাই ও এক বোন থাকতেন। তাঁদের মধ্যে বড়ো দাদা কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ভাইয়ের দেওয়া ধনরত্ন দিয়ে একের পর এক মৌজায় জমি কেনেন। তখন হাতির পিঠে চড়ে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে করা হত। তা মজুত করার জন্য কাছারি বাড়ি স্থাপন করা হয়। ধীরে ধীরে এলাকায় প্রভাব ও প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। প্রথম দিকে জমিদারবাড়িতে দুর্গা পুজোর প্রচলন ছিল না। গ্রামের মধ্যে পুজো হত। কিন্তু, জমিদার গিন্নি ভিড়ের মাঝে দেবী দুর্গার আরাধনা ঠিকমতো করতে পারছিলেন। বিষয়টি জানার পর জমিদার মহলের মধ্যে পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে ঠাকুরদালান, রাসমঞ্চ, নাটমন্দির ছাড়াও সারিবদ্ধভাবে ১২টি শিবের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়।



