Bartaman Logo
৯ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিক্ষোভের পাশাপাশি জনসংযোগও জরুরি

রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ৮০ বছর ধরে চেষ্টা করে চলেছে। তাদের শাখা আছে। প্রশিক্ষণ আছে। ঘরে ঘরে যাওয়া আছে।

বিক্ষোভের পাশাপাশি জনসংযোগও জরুরি
  • ৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ৮০ বছর ধরে চেষ্টা করে চলেছে। তাদের শাখা আছে। প্রশিক্ষণ আছে। ঘরে ঘরে যাওয়া আছে। হিন্দুত্ব সম্পর্কে মানুষের মনের মধ্যে কিছু ভাবনা প্রবেশ করিয়ে দেওয়া আছে। এত বছরের চেষ্টায় ধীরে 

Advertisement

ধীরে একটি প্রবল শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হয়েছে। আজ থেকে নয়। বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে অফিসে, আদালতে, সংবাদমাধ্যমে, স্কুলে, কলেজে, কারখানায়, বাজারে, ক্লাবে সকলের অলক্ষ্যে প্রবেশ করেছে সংঘের আদর্শে নিবেদিতপ্রাণ লক্ষ লক্ষ ক্যাডার। আর ক্ষমতায় আসার পর আছে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ স্তরে সংঘ প্রশিক্ষিতদের বসিয়ে দেওয়া। 
বিজেপি একমাত্র পার্টি যারা সর্বাগ্রে হিন্দুত্ব, রামমন্দির, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, ৩৭০ নং ধারার অবলুপ্তি ইত্যাদি ইস্যুকে নিজেদের একান্ত লক্ষ্য ও অ্যাজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। আজ পর্যন্ত সেই একই মনোভাবে তারা রাজনীতি করে। একবারের জন্য বিজেপি সেকুলার হওয়ার চেষ্টা করে না। কারণ, তারা জানে তাদের বহু কষ্টে তৈরি ভোটার, সমর্থক, ক্যাডার কারা। সুতরাং কোনোভাবেই তাদের অখুশি করতে বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষ পথে হাঁটেনি। সেই কারণে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ কিংবা বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যতই মাঝেমধ্যে প্রগতিশীলের মতো বক্তব্য দিক না কেন, তাদের কারও ক্ষমতা নেই বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, দুর্গাবাহিনীদের উগ্র হিন্দুত্ববাদী কোনো কর্মসূচির বিরুদ্ধে অথবা নেতানেত্রীদের কঠোর ধমক দেওয়ার। কারণ এই সংগঠনগুলিই বিজেপির অ্যাজেন্ডা পূরণের অস্ত্র। 
আরএসএস পাড়ায় পাড়ায় ঢুকে পড়ে হিন্দুত্ববাদী সিলেবাসে নিমজ্জিত করে দেয় নাগরিকদের। অন্যদিকে, এই শাখা সংগঠনগুলির সদা সর্বদা সক্রিয়তা, নজরদারি, ধর্মীয় উন্মাদনা ও উৎসবকে জাগ্রত করে মাতিয়ে রাখা লক্ষণীয়। পাশাপাশি কেন্দ্র এবং রাজ্যে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা, হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তিত্বকে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী করে রাখার চেষ্টা চলে। উন্নয়নের স্বপ্ন ফেরি করে। 
সব মিলিয়ে একটি সুপরিকল্পিত কৌশল, স্ট্র্যাটেজি। ক্ষমতাসীন হয়েই সর্বাগ্রে টার্গেট করা হয় নব প্রজন্মকে। সিলেবাস বদল। আধুনিক ভারত যাঁরা নির্মাণ করেছেন, তাঁদের সম্পর্কে লাগাতার অপবাদ। যাতে নবপ্রজন্ম মনে করে সত্যিই জওহরলাল নেহরু এবং তাঁর সঙ্গীরা কিংবা কংগ্রেস নামক দল দেশের অনেক ক্ষতি করেছে। এজন্য ইতিহাসকে বদলে দেওয়া, বিকৃত করা, নতুন করে ইতিহাস লেখা এসব প্রজেক্টও নেওয়া হয়েছে। 
প্রশ্ন হল, এই যে নিরন্তর একটি রাজনৈতিক বিন্যাস সৃষ্টি করে, মানুষের মধ্যে মিশে গিয়ে সমাজের সর্বস্তরে মানুষকে প্রভাবিত করে নিজেদের প্রচারকে পৌঁছে দেওয়া হয়, এর পালটা কংগ্রেস কী করেছে?   রাহুল গান্ধী অবশ্য জনসংযোগের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু অন্য দলগুলি কী করেছে? বিরোধীদের এই অধ্যবসায় কোথায়? সংঘের রণকৌশলকে পরাজিত করে মানুষকে নিজেদের কাছে ধরে রাখতে বিরোধীরা তেমন কিছুই করেনি। তাদের সেই অনুশীলন কোথায়? ধর্মনিরপেক্ষতা, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য, বহুত্ববাদী ভারতের পক্ষে পালটা প্রচার করতেই পারত তারা। কিন্তু করেনি।  পিছিয়ে পড়েছে বিরোধীরা। 
রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক প্রভাব এবং অর্থক্ষমতা—এই তিনটি থাকলে ভারতকে শাসন করা জলের মতো সহজ। বিজেপি ও সংঘ পরিবার এই তিনটিই করায়ত্ত করেছে। অন্তহীন অর্থ সম্পদের পাহাড়ে বসেছে বিজেপি। অঘোষিত হিন্দুরাষ্ট্র পরিণত করেছে সংঘ। সমাজে প্রভাব বিস্তারের জন্য উচ্চতম প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মতাদর্শ ব্যর্থ হলে অর্থসম্পদ আছে। অর্থসম্পদ ব্যর্থ হলে ভয় দেখানো আছে প্রশাসনিক ক্ষমতা দেখিয়ে। অর্থাৎ জেলে পাঠানোর ভয়, গ্রেপ্তার করার ভয়, সামাজিক বদনামের ভয় ইত্যাদি। তাই বিদ্রোহী শিবসেনা কিংবা বিদ্রোহী তৃণমূল, যেই হোক, প্রায় সকলেই ব্যক্তিগত ইমেজ জলাঞ্জলি দিয়েও আত্মসমর্পণ করেছে। কেউ অর্থের কাছে। কেউ ভয়ের কাছে। আত্মসম্মান অথবা মেরুদণ্ড সবটাই ভেঙে দেওয়ার এক রাজনীতি সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। 
এহেন এক মহাশক্তিশালী  সংঘকে, দলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধীরা যা করছে, সেটি কি যথেষ্ট? বিজেপিকে যেভাবে দাঁতে দাঁত চেপে সর্বস্তরে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায় নিজেদের সমর্থনে, তার বিন্দুমাত্র ছাপ কি দেখা যাচ্ছে বিরোধীদের মধ্যে? 
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনে অভিযান করতে না পেরে বিরোধীরা সংসদ মার্গ এবং আকাশবাণীর ভিতরে একদিন ১০ ঘণ্টা ধরে বিক্ষোভ অবস্থান ও পুলিশের সঙ্গে সংঘাত করেছে। আহত হয়েছে। প্রচুর ছবি উঠেছে। ছবি তোলা এবং মিডিয়ার ভিডিয়োর জন্যই পুলিশের দেওয়া ব্যারিকেড তথা গার্ড রেলে উঠে পড়েছেন নেতানেত্রীরা। পোজ দিয়েছেন। কিন্তু তার ঠিক পরদিনই তাঁরা দিল্লির অভিজাত স্থান কনট প্লেসের সংলগ্ন জনপথ রোডের দামি রেস্তরাঁ সাগররত্নে লাঞ্চ করতে গিয়েছেন। লাঞ্চ করে হাসাহাসি করতে দেখা গিয়েছে। এসব দৃশ্য কী বার্তা দেয়? তারপর আবার নির্বাচন কমিশনের দিকে যাত্রা। আবার দিল্লি পুলিশ আটকে দিয়েছে। আবার সংঘাত। আবার ছবি। আবার ভিডিয়ো। আবার মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সেগুলি প্রচারিত। এসবের পর সংগঠিত একটি রাজনৈতিক রোডম্যাপ তো থাকবে? সেটা কী?
বিরোধীদের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অথবা রোডম্যাপ নেই বলেই ককরোচ জনতা পার্টির উপর ভরসা তৈরি হয়েছে মানুষের। তাদের কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেই। তারা এখনও পর্যন্ত অরাজনৈতিক নাগরিক সংগঠন। তারা বিক্ষোভ, পদযাত্রা, অভিযান, অবস্থান, অনশনের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। তবু তারা সবথেকে সফল হয়েছে সম্প্রতি। এই প্রথম মোদি সরকার নার্ভাস হয়েছে, পিছু হটেছে। মন্ত্রী পদত্যাগ করেছে। সুতরাং ককরোচ তাদের মতো করে ছাত্র যুবকে একজোট করতে সক্ষম হয়েছে অভিনবভাবে। তারা সেটাই করুক। 
কিন্তু ইন্ডিয়া জোট কী করছে? তারা এই বিক্ষোভ আন্দোলন, পুলিশের সঙ্গে সংঘাত সবই করুক। এসবই রাজনৈতিক হাতিয়ার।  তারপর কী? কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, আম আদমি পার্টি, এনসিপি (শারদ পাওয়ার), শিবসেনা (উদ্ধব), এই এতগুলি দলের আগামী দেড় বছরের রাজনৈতিক প্ল্যান কী? সেটা কি দেখা যাচ্ছে? নাকি বোঝা যাচ্ছে? মানুষের সঙ্গে নিজেদের রাজ্যে এই দলগুলি নিয়ম করে সংযোগ তৈরি করছে? ঘরে ঘরে যাচ্ছে? পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে মানুষকে কাছে টানার চেষ্টা করছে? করছে না। 
দিল্লিতে দল বেঁধে যন্তরমন্তর আর সংসদ মার্গে বিক্ষোভ দেখানো নিরাপদ। সেখানে ভিড় আছে। মিডিয়া আছে। রাজধানীর অ্যাটেনশন আছে। সব বোঝা গেল। কিন্তু নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে যদি ভোটের নামে রিগিং হয়, তাহলে সেটার প্রতিরোধে কিংবা প্রতিবাদে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলির নেতানেত্রীরা কোথায়? সেখানে তো ভোট নিশ্চিত করে বিজেপি কার্য সমাধা করে ফেলল। 
এসআইআরে বাংলার যে ৯১ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে, তাদের বিচার পাইয়ে দিতে কী করছে সিপিএম, তৃণমূল, কংগ্রেস? ট্রাইবুনালে কারা ছুটে বেড়াচ্ছে? সোজা কথায় আরএসএস এতকাল ধরে জনসংযোগ করে গেল নিজেদের মতো করে। বর্তমান বিরোধী দলগুলির সেই মাত্রার জনসংযোগ কোথায়?  ভোটারের পাশে গিয়ে আশ্বস্ত করা অথবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ নিরন্তর রেখে চলা এসব কোথায়? পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীদের কথা শুনলে বোঝা যায় যে, তারা বসে আছে যদি ২০২৯ সালে মোদি সরকারের পতন হয়, তাহলে এ রাজ্যে বিজেপি দল ও সরকার দুর্বল হবে। দিল্লিতে যন্তরমন্তরে আন্দোলন করে মহাশক্তিমান মোদি সরকারকে পরাজিত করা এত সহজ নয়। সামান্য নন্দীগ্রাম, রেজিনগরে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলি একজোট হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে একজন মাত্র সম্মিলিত প্রার্থী দিতে পারল? পারেনি। সবাই আলাদা প্রার্থী দিল। কী লাভ হবে? তাদের রাজ্যে কুস্তি দিল্লিতে দোস্তির স্লোগানে কে গুরুত্ব দেবে? 
অখিলেশ যাদব কী করছেন উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালে যোগীকে পরাজিত করার জন্য? ২ কোটির বেশি নাম বাদ গিয়েছে এসআ‌ইআর-এ। কোথায় সেই প্রবল বিক্ষোভ? একই পরিস্থিতি রাষ্ট্রীয় জনতা দলের। তেজস্বী যাদবের দল সেরকম কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা লাগাতার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ আন্দোলন করছে, এরকম কোনো দৃশ্য দেখা যায় না। ইন্ডিয়া জোট যে এত বিক্ষোভ করছে, তাদের কোন দলের প্রবল জনপ্রিয়তা রয়েছে নিজেদের রাজ্যে? কেউ আর জনপ্রিয় দল নয়। সকলেই বিজেপির কাছে পরাজিত। বৈধ অথবা অবৈধ, যে কোনো উপায়ে। যারা ইন্ডিয়া জোটে নেই, সেই আম আদমি পার্টি, ডিএমকে, বিজু জনতা দল, ভারত রাষ্ট্র সমিতিও কেউ এখন আর জনপ্রিয় ও সংগঠনগতভাবে শক্তিশালী দল নয়। 
ইন্ডিয়া জোটকে ভাবতে হবে তারা আদালতে যাচ্ছে, রাস্তায় নামছে, সবই কিন্তু পুরানো ধাঁচের রাজনীতি। জরুরি অবস্থার সময় এরকমই হয়েছিল। কিন্তু এখন নতুন সময়। অথচ নতুন রাজনীতি আনতে পারছে না তারা। যদি ইন্ডিয়া জোট মনে করে যে, এসআইআর বাতিল না হলে কোনো ভোট বৈধ হবে না। ভোটার তালিকাই অবৈধ। তাহলে কি আসন্ন সব ভোট বয়কট করা উচিত? নাকি অন্য কোনো পথ? ইন্ডিয়া জোটকে বড়োসড়ো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ