নিজস্ব প্রতিনিধি, মালদহ: দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে পুনর্ভবা নদীতে ঘট ভরতে যাওয়া। তারপর শূন্যে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুড়ে পুজো শুরু মালদহের তিলাসন সিংহাবাদ জমিদার বাড়িতে। আশপাশের সব গ্রাম মেতে উঠেছে এই পুজোয়। অষ্টমীতে জমিদার বাড়িতে সবার পাত পেড়ে খাওয়ার নিমন্ত্রণ। আগেই কার্ড দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিমন্ত্রণ সেরে এসেছেন জমিদার বাড়ির সদস্যরা। বহু বছর ধরে এটাই রীতি। মুঠোফোন, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও তিলাসন জমিদার বাড়ির পুজোর নিমন্ত্রণের কার্ড পেতে বছর ভর অপেক্ষা করেন এলাকার বাসিন্দারা। মৃন্ময়ী দশভুজার পাশাপাশি সোনার দুর্গা পূজিতা হন তিলাসন জমিদার বাড়িতে। রয়েছে কুমারী পুজোর রীতিও।
জমিদার পরিবারের বর্তমান বংশধর রাকেশকুমার রায় বলেন, এই প্রথা চলে আসছে প্রথম থেকে। গুলি ছোড়ার মধ্যে দিয়ে পুজো শুরু হয় জমিদার বাড়ির। এবার অবশ্য শূন্যে গুলি ছোড়ার অনুমতি নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েন চলে। নদীর ঘাট এখন বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে। ফলে সেখানে ঘট ভরতে যেতে গেলে বিএসএফের অনুমতি নিতে হয়। সেই অনুমতি মিললেও কাঁটাতারের বেড়ার ভিতরে ফায়ারিংয়ের অনুমতি দিতে নারাজ বিএসএফ কর্তৃপক্ষ। ফলে এবার আদৌও শূন্যে গুলি ছুড়ে পুজো শুরুর প্রথা অক্ষুন্ন রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। অনেক আবেদনের পর নদীতে ঘট ভরতে যাওয়ার সময় কাঁটাতারের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে দু’রাউন্ড ফায়ারিং হয় শনিবার সকালে। ঘট ভরে নিয়ে বাড়িতে ফেরার পর নাটমন্দিরে দাঁড়িয়ে তিন রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে শূন্যে।
প্রায় আড়াইশো বছর আগের কথা। উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর জেলা থেকে ডালের ব্যবসা করতে এসেছিলেন অবোধ নারায়ণ রায়। পুনর্ভবা নদীর তীরে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের তিন ‘পলাতক’ সন্ন্যাসীর সঙ্গে। তাঁদের পরামর্শে জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা জায়গা সাফ করে বসতি স্থাপন করেন অবোধ নারায়ণ। সেই শুরু। পরবর্তীতে দিনাজপুরের রাজ পরিবারের কাছ থেকে জমি কেনেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সম্পত্তি। ৫২টি মৌজার মালিক হয়ে প্রতিষ্ঠা পান জমিদার হিসাবে। জমিদারি পত্তনের পর সন্ন্যাসীর পরামর্শে দুর্গাপুজো শুরু করেন অবোধ নারায়ণ। সালটা ১২১২ বঙ্গাব্দ। পরে তাঁর ছেলে শিবপ্রসাদ রায়ের হাত ধরে নির্মাণ হয় দুর্গামন্দির।
জমিদারি নেই। ফলে জৌলুস হারিয়েছে পুজো। কিন্তু আজও তিলাসন জমিদারবাড়ির পুজোয় অটুট ঐতিহ্য। সময় পালটালেও বদলায়নি পুজোর নিয়ম। দেবী দুর্গার নামে সম্পত্তি রয়েছে। তা দিয়েই পুজোয় খরচ হয়।
শিবপ্রসাদ রায়ের আমল থেকে বৈষ্ণব মতে পুজো শুরু হয়। প্রতিদিন মায়ের ভোগে পায়েস, মিষ্টি এবং অবশ্যই দই নিবেদন করা হয়। একসময় বোঁদে-জাতীয় দই বা ‘ছনৌরি’ নামক মিষ্টি ভোগের তালিকায় থাকত। কারিগরের অভাবে এখন আর তা হয় না। দশমী পুজো শেষে প্রথা মেনে বাড়ির সদস্যদের হাতে ‘অপরাজিত বলয়’ বেঁধে দেন পুরোহিত। বিসর্জনের প্রাক মুহূর্তে বাড়ির মহিলারা মাকে সিঁদুর পরিয়ে বিদায় জানান। একে বলা হয় ‘পরছন’।



